উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত শহর বগুড়ায় দিন দিন বাড়ছে যানজটের সমস্যা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রধান সড়কে লেগেই থাকে দীর্ঘ যানজট। এতে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা। সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জানা গেছে, বগুড়া শহরের যানজটের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান চারটি কারণ হলো অবৈধ বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, সিএনজি ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড এবং শহরের ভেতরে কুরিয়ার ট্রাকের অবাধ চলাচল। এসব কারণে শহরের সড়কগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শহরের সাতমাথা, জিরো পয়েন্ট, চারমাথা, খান্দার, চেলোপাড়া, বনানী, মালতিনগর ও কলোনি এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়গুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। অবৈধ বাসস্ট্যান্ডে সড়কে বাড়তি চাপ: বগুড়া শহরের যানজট সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ বাসস্ট্যান্ড। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড না থাকায় অনেক পরিবহনের বাস যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এতে সড়কের একটি বড় অংশ কার্যত বাসের দখলে চলে যায়। ফলে অন্য যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, শহরের সাতমাথা, জিরো পয়েন্ট, ইয়াকুবিয়া মোড়, মফিজপাগলার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখা যায়। অনেক বাস নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না মেনে রাস্তার মাঝখানেই থেমে যাত্রী তোলে ও নামায়। এতে পিছনে থাকা গাড়িগুলো ধীরে ধীরে আটকে পড়ে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই যানজট লম্বা হতে থাকে। স্থানীয়রা জানান, বিশেষ করে শহরের প্রবেশমুখ ও ব্যস্ত মোড়গুলোতে বাসগুলো প্রায়ই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় বাস চালকেরা যাত্রী পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় সড়কের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে একদিকে সড়কের প্রস্থ কমে যায়, অন্যদিকে অন্যান্য যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। ফলে পুরো এলাকায় যান চলাচলের গতি কমে গিয়ে বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়। শহরের সাতমাথা এলাকায় ব্যবসা করেন মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাতমাথা ও আশপাশের এলাকায় প্রায়ই দেখা যায় বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলে। তখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই পেছনে অনেক গাড়ি আটকে যায় এবং লম্বা যানজট তৈরি হয়। এতে শুধু যাত্রী নয়, আশপাশের ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়েন। অনেক সময় ক্রেতারা দোকানে আসতেই পারেন না। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মীরাজুল জানান, ব্যস্ত সময়ে যদি কয়েকটি বাস একসঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন পুরো এলাকায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনগুলোও আটকে থাকে। এতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। শহরবাসীর অভিযোগ, অবৈধভাবে সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চললেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত নজরদারি ও নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড চালু করলে এই সমস্যার অনেকটাই কমে আসবে। ফুটপাত দখলে পথচারীদের দুর্ভোগ: শহরের যানজট সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে ফুটপাত দখল। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে দোকানপাট ও অস্থায়ী ব্যবসা গড়ে ওঠায় পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেককেই সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে। এতে একদিকে পথচারীরা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে সড়কে যানবাহনের চলাচলেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। শহরের স্টেশন রোড, সার্কিট হাউজ রোড, নবাববাড়ী রোড, ষ্টেশনরোড, সুত্রাপুর রোড, সাতমাথা ও চেলোপাড়া এলাকার বেশিরভাগ ফুটপাতই বিভিন্ন দোকান, ভ্যানগাড়ি ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের দখলে রয়েছে। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও ফল বা খাবারের স্টল, আবার কোথাও ছোটখাটো হকারদের পসরা বসানো হয়েছে। ফলে ফুটপাতের আসল উদ্দেশ্য পথচারীদের নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় দেখা যায়, শুধু ফুটপাত নয়, দোকানের মালামালও ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের দিক পর্যন্ত চলে এসেছে। এতে পথচারীদের জন্য জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা সড়কের পাশে বা মাঝামাঝি দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। এতে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং সামান্য সময়ের মধ্যেই ওই এলাকায় যানজট তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যস্ত সময়ে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের ভিড় বাড়লে ফুটপাত দিয়ে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন অনেকেই ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হন বা রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটেন। শহরের একটি কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমান বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই বললেই চলে। দোকান আর মালামালে পুরো ফুটপাত ভরে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং গাড়ির গতিও কমে যায়। পথচারী আকরাম হোসেন জানান, অনেক সময় ছোট শিশু বা বয়স্ক মানুষদের নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ সেখানে হাঁটার মতো জায়গাই থাকে না। এতে পরিবার নিয়ে চলাচল করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা গেলে পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবেন এবং সড়কের ওপর চাপও অনেকটা কমে যাবে। এজন্য নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সিএনজি ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড: যানজটের আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সিএনজি ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়কের পাশ ও ব্যস্ত এলাকায় অস্থায়ীভাবে এসব যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় চালকেরা নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী অপেক্ষা করেন। এতে সড়কের একটি বড় অংশ দখল হয়ে যায় এবং অন্য যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। সাতমাথা, জিরো পয়েন্ট, শেরপুর রোড, ষ্টেশনরোড, চেলোপাড়া ও দত্তবাড়িসহ বেশ কয়েকটি ব্যস্ত এলাকায় প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখা যায়। অনেক সময় একসঙ্গে বেশ কয়েকটি অটোরিকশা বা সিএনজি রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার অনেক চালক যাত্রী পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় একই জায়গায় অবস্থান করেন। এতে সড়কের প্রস্থ কমে যায় এবং যান চলাচলের গতি ধীর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অফিস ও স্কুল-কলেজ ছুটির সময় যাত্রী সংখ্যা বেড়ে গেলে অনেক চালক যাত্রী পাওয়ার আশায় মোড়ের কাছাকাছি বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গাড়ি থামিয়ে রাখেন। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই এলাকায় যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় রিকশা, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো এসব অটোরিকশার কারণে সামনে এগোতে পারে না। এসব অস্থায়ী স্ট্যান্ডের কারণে অনেক সময় মোড়ের দৃশ্যমানতাও কমে যায়। ফলে যানবাহনের চালকদের জন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে সরু সড়কগুলোতে অটোরিকশা বা সিএনজির সারি দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য যানবাহনের চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। অটোরিকশা চালক মনির হোসেন বলেন, আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যান্ড নেই। তাই বাধ্য হয়েই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে হয়। অনেক সময় পুলিশ এসে সরিয়ে দেয়, কিন্তু অন্য কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা না থাকায় আবারও একই জায়গায় ফিরে আসতে হয়। তিনি আরও বলেন, যদি শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট অটোরিকশা বা সিএনজির স্ট্যান্ড নির্ধারণ করা হয়, তাহলে চালকদেরও সুবিধা হবে এবং সড়কে যানজটও অনেকটা কমে যাবে। কুরিয়ার ট্রাকের অবাধ চলাচল: যানজটের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে কুরিয়ার ও পরিবহন কোম্পানির বড় ট্রাকের অবাধ চলাচল। শহরের ভেতরে দিনের ব্যস্ত সময়েও এসব বড় আকারের ট্রাক ঢুকে পড়ছে এবং বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে মালামাল ওঠানামা করছে। এতে সড়কের স্বাভাবিক যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং মুহূর্তের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। শহরে বিভিন্ন কুরিয়ার অফিসের সামনে প্রায়ই বড় ট্রাক থামিয়ে রাখতে দেখা যায়। এসব ট্রাক থেকে পার্সেল, পণ্য বা কুরিয়ার মালামাল নামানো ও তোলার কাজ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। এ সময় সড়কের একটি বড় অংশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্য যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সরু সড়কে ট্রাক থামিয়ে রাখার কারণে অন্য যানবাহন পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। ফলে পুরো সড়কেই যানবাহনের সারি জমে যায়। এতে সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালক সবাই ভোগান্তিতে পড়েন। শহরের রিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, বড় ট্রাক যখন শহরের ভেতরে ঢোকে তখন গাড়ি চলাচল একেবারে ধীর হয়ে যায়। অনেক সময় ট্রাকের কারণে পুরো রাস্তা আটকে থাকে। তখন রিকশা নিয়ে সামনে এগোনোই কঠিন হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শহরের ভেতরে দিনের ব্যস্ত সময়ে ভারী যানবাহন প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে এসব ট্রাককে শহরে প্রবেশের অনুমতি দিলে যানজট অনেকটাই কমে আসতে পারে। প্রশাসনের উদ্যোগেও সমাধান নেই: মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ফুটপাতের দোকান সরানো হয়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সেই জায়গায় দোকান বসে যায়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। এক সপ্তাহ আগে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান নিজে অভিযান করে পুলিশ প্লাজার সামনে একটি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরপরই সেই দোকানটি আবার চালু হয়। গত একমাসে এই ধরনের ৭টি অভিযানের পরেও ফুটপাত মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান বলেন, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান শেষ হলেই দোকানিরা আবার বসে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে একরকম চোর-পুলিশ খেলা চলে। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) জেলা সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, বছরের পর বছর ধরে ফুটপাত ও সড়কে এই বিশাল বাণিজ্য কীভাবে চলছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে সাতমাথা মোড় অবৈধ স্ট্যান্ডে পরিণত হলে যানজট কমবে কীভাবে। তার মতে, কারা এসবের সঙ্গে জড়িত তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে শহরের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এলবি/এনএইচআর/জেআইএম