মিত্র থেকে শত্রু: আফগান তালেবানের ওপর পাকিস্তানের হামলার নেপথ্যে কী?

বহু দশক ধরে আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল পাকিস্তান। ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ অর্জনের কৌশল হিসেবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তালেবান গঠনে ইসলামাবাদের বড় ভূমিকা ছিল। তাহলে এখন আসলে সংকট ঠিক কোথায়?সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রতিবেশী দেশ দু’টির মধ্যে লড়াই যে তীব্র হয়েছে, সোমবারের হামলা তারই সবশেষ ঘটনা। তালেবান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে চালানো এই হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, তারা ‘সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসী সহায়ক অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত মাসে বলেছিলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন ‘প্রকাশ্য যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আফগানিস্তানে ‘জঙ্গি ঘাঁটিতে’ বিমান হামলা চালায়। এরপর একই মাসে আফগানিস্তানের বড় বড় শহরগুলোতে একাধিক বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। সীমান্তজুড়ে বিভিন্ন সেক্টরে তালেবানের সামরিক পোস্ট, সদর দফতর ও অস্ত্রভাণ্ডারে আঘাত হানে এসব হামলা। কর্মকর্তাদের দাবি, আফগানিস্তান আগে পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর পরই এই অভিযান শুরু হয়। এর আগে অক্টোবর মাসে সীমান্ত সংঘর্ষে দুই দেশের বহু সেনা নিহত হয়। পরে তুরস্ক, কাতার এবং সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় আলোচনা শেষে সংঘর্ষ থামে এবং একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।  আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের হাসপাতালে পাকিস্তানের হামলায় নিহত ৪০০ ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত তালেবানদের প্রতি ইসলামাবাদের ঐতিহাসিক সমর্থন থেকে অনেক দূরে। মূল প্রশ্নগুলো হলো:  কেন এখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিরোধ? ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছিল পাকিস্তান। দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে’। কিন্তু দ্রুতই ইসলামাবাদ বুঝতে পারে, তালেবান তাদের প্রত্যাশামতো সহযোগিতা করছে না। ইসলামাবাদ বলছে যে, জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর নেতৃত্ব এবং এর বহু যোদ্ধা আফগানিস্তানে ঘাঁটি গেড়েছে এবং পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও আফগানিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে। বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর জঙ্গিবাদ বেড়েছে এবং টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও পাকিস্তানে হামলা চালানোর জন্য জঙ্গিদের আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দেয়ার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে কাবুল। অন্যদিকে আফগান তালেবানের দাবি, পাকিস্তান তাদের শত্রু আইএস-এর যোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়, যা অস্বীকার করে ইসলামাবাদ। আরও পড়ুন: আফগানিস্তান ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করেছে, অভিযোগ পাকিস্তানের ইসলামাবাদের ভাষ্য, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে জঙ্গিদের অব্যাহত হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি বেশিদিন টেকেনি এবং এরপর থেকে বারবার সংঘর্ষ ও সীমান্ত অবরোধের ঘটনা ঘটেছে, যা এই দুর্গম সীমান্ত বরাবর বাণিজ্য ও চলাচল ব্যাহত করেছে।  সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূচনা কীভাবে?  ফেব্রুয়ারির হামলার আগের দিন, পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলেছিল যে তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ আছে যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলা ও আত্মঘাতী বোমা হামলার পেছনে ছিল আফগানিস্তানের জঙ্গিরা।  ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে জঙ্গিদের চালানো সাতটি পরিকল্পিত বা সফল হামলার তালিকা দেয় সূত্রগুলো, যেগুলো তাদের মতে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যানুসারে, এর মধ্যে একটি হামলায় বাজৌর জেলায় ১১ জন নিরাপত্তাকর্মী ও দুইজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, আর ওই হামলা চালিয়েছিল আফগানিস্তানের একজন নাগরিক। হামলার দায় স্বীকার করে টিটিপি। কারা এই পাকিস্তানি তালেবান? টিটিপি ২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন দ্বারা গঠিত হয়েছিল। এটিই সাধারণত পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত। তারা বিভিন্ন সময় বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে। আফগান সীমান্ত অঞ্চল ছাড়াও পাকিস্তানের ভেতরে, এমনকি সোয়াত উপত্যকাতেও তাদের প্রভাব ছিল। এই গোষ্ঠীই ২০১২ সালে মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলা চালায়। এর দুই বছর পর তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। টিটিপি আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের পক্ষেও লড়াই করেছে এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে।  আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: পাকিস্তানকে সমর্থন জানালো যুক্তরাষ্ট্র এরপর কী হতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তার সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে এবং এর জবাবে কাবুল সীমান্ত চৌকিতে হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আরও আন্তঃসীমান্ত গেরিলা হামলা চালাতে পারে। উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক থাকায় চীনের হস্তক্ষেপ এবং উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টার পর লড়াই কমে এসেছিল, কিন্তু প্রতিবেশী অঞ্চলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের মধ্যে তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতায় ব্যাপক অসামঞ্জস্য রয়েছে। তালেবানের সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার হলেও, তা পাকিস্তানের মোট সদস্য সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। তালেবানদের কাছে অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অজানা এবং তাদের কোনো যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমান বাহিনী নেই।  আরও পড়ুন: পাকিস্তান-আফগানিস্তানকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে ৬ লাখেরও বেশি সক্রিয় সদস্য, ৬ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রেও সজ্জিত। সূত্র: রয়টার্স