ইসরাইল ও যুক্তরাস্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে ইরানের বেশ কিছু অঞ্চল নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপ অন্যতম যা পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীর ভেতরে অবস্থিত। যুদ্ধের প্রথম দিকে দক্ষিণ ইরানের এই কেশম দ্বীপের একটি পানি ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালানো হয়েছিল।দ্বীপটি এর জটিল লবণের গুহা আর সবুজ ম্যানগ্রোভ বনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এই সৌন্দর্যের নিচেই আরেক ধরনের গোপন স্থাপনা লুকিয়ে আছে। এক সময় পর্যটকেরা এই জায়গাটিকে ‘খোলা আকাশের নিচের ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ হিসেবে দেখতে আসত, মুগ্ধ হয়ে দেখত এর অদ্ভুত পাথরের গঠন। কিন্তু এখন সবার দৃষ্টি মাটির নিচে এক লুকানো জিনিসের দিকে। আর তা হলো—ইরানের ‘ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কেশম দ্বীপের গুরুত্ব অনেক বদলে গেছে। আগে এটি ছিল একটি মুক্ত বাণিজ্য এলাকা এবং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। কিন্তু এখন এটি যুদ্ধের কারণে সামনের সারির একটি শক্ত ঘাঁটিতে (ফ্রন্টলাইন দুর্গে) পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থান করায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনীর জন্যও বড় লক্ষ্যবস্তু। প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি উপসাগর থেকে প্রণালীতে প্রবেশের পথ নিয়ন্ত্রণের মতো অবস্থানে রয়েছে। ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দ্বীপটিতে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ বাস করেন, যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম এবং ‘বান্দারি’ নামে একটি বিশেষ উপভাষায় কথা বলেন। তাদের জীবন এখনও সাগরকেন্দ্রিক। প্রতি বছর ‘নওরোজ সাইয়াদি’ বা জেলেদের নববর্ষ উপলক্ষে মাছ ধরা বন্ধ রেখে সাগরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। আরও পড়ুন: আইআরজিসির বাসিজ ফোর্স কমান্ডারকে হত্যার দাবি ইসরাইলের তবে যুদ্ধের এক সপ্তাহ পর গত ৭ মার্চ দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এটিকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট অপরাধ’ বলে আখ্যা দেয়। এই হামলার ফলে আশপাশের ৩০টি গ্রামের পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর জবাবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বাহরাইনের জুফাইর ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। কারণ কেশমে হামলা পাশের একটি উপসাগরীয় দেশ থেকে পরিচালিত হয়েছিল। হরমুজ প্রণালীর ‘মিসাইল শহর’ ১৯৮৯ সাল থেকে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও এখন কেশমকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের ‘বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাস শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি প্রণালির নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ইরানের দ্রুতগতির নৌযান ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ জটিল নেটওয়ার্কে লুকানো রয়েছে। লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান জৌনি আল জাজিরাকে বলেন, কেশমে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল শহর’ রয়েছে এবং সেখানে ইরানের আক্রমণ সক্ষমতা সঞ্চিত আছে। এর মূল উদ্দেশ্য— হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ বা প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হুমকির কারণে এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল অল্প কিছু জাহাজ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য যেতে দেয়া হচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজের বহর গঠন করে এই পথ খুলে দেয়ার চেষ্টা করছে। আরও পড়ুন: এবার লারিজানিকেও হত্যার দাবি ইসরাইলের যখন কেশম দ্বীপ একুশ শতকের জ্বালানি-কেন্দ্রিক যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, তখন এর নীরব লবণের গুহা আর প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাগুলো আমাদের একটি কথা মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাসে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের মতো বহু সাম্রাজ্য ও সামরিক জোট একসময় শক্তিশালী ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হারিয়ে গেছে। অথচ এই প্রণালীর প্রাকৃতিক গঠন—একটি শক্তিশালী ভূ-প্রাকৃতিক দুর্গের মতো—এখনও টিকে আছে, এবং ইতিহাসের উত্তাল সময়ের মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। এক দ্বীপের অনেক নাম কেশম দ্বীপের ইতিহাসও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। আরবিতে একে বলা হয় ‘জাজিরাত আল-তাওয়িলা’ বা দীর্ঘ দ্বীপ। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের হাত ঘুরে এর পরিচয় গড়ে উঠেছে। গ্রিক অভিযাত্রী নিয়ারখাস একে ‘ওআরাক্টা’ নামে উল্লেখ করেছিলেন। নবম শতকে ইসলামী ভূগোলবিদরা একে ‘আবারকাওয়ান’ নামে ডাকতেন, যা পরে ‘গাভান দ্বীপ’ নামেও পরিচিত হয়। ১৩০১ সালে তাতারদের আক্রমণ এড়াতে হরমুজের শাসকরা তাদের দরবার এই দ্বীপে সরিয়ে নেন। দীর্ঘ সময় এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য পানির প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৫৫২ সালে অটোমান নৌ-কমান্ডার পিরি রেইস দ্বীপটি দখল করে বিপুল সম্পদ হস্তগত করেন। আরও পড়ুন: উপসাগরীয় দেশে ইরানের হামলায় ‘হতবাক’ ট্রাম্প, সতর্ক করা হয়েছিল আগেই ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা এখানে একটি বড় দুর্গ নির্মাণ করে। তবে এক বছর পর পারস্য ও ইংরেজদের যৌথ অভিযানে তারা বিতাড়িত হয়। ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ নাবিক উইলিয়াম ব্যাফিন নিহত হন। ঊনিশ শতকে ব্রিটিশরা বাসিদু এলাকায় নৌঘাঁটি স্থাপন করে এবং সেটি ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। পরে ১৯৩৫ সালে ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভির অনুরোধে তারা ঘাঁটিটি পরিত্যাগ করে। আক্রমণের মুখে এক জাদুঘর সামরিক নজরদারি টাওয়ার আর আইআরজিসির ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির বাইরেও, কেশম দ্বীপ এখনও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এলাকা। এখানে রয়েছে হারা ম্যানগ্রোভ বন, যা পরিযায়ী পাখিদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ক্ষেত্র। এছাড়া আছে কেশম জিওপার্ক—এ ধরনের অঞ্চলের মধ্যে এটি ছিল প্রথম, যা ২০০৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়।দ্বীপটির উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্টারস ভ্যালি: হাজার বছরের ক্ষয়ে তৈরি শিলা ও উপত্যকার বিস্ময়কর গঠন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, উল্কাপাতের ফলে এর সৃষ্টি হয়েছিল।নামাকদান লবণ গুহা: বিশ্বের দীর্ঘতম লবণ গুহাগুলোর একটি। এর দৈর্ঘ্য ৬ কিলোমিটারের বেশি।চাহকুহ ক্যানিয়ন: চুনাপাথর ও লবণের তৈরি সরু গভীর গিরিখাত। এটি প্রাকৃতিক পাথরের গির্জার মতো দৃশ্য তৈরি করেছে।