তেল, যুদ্ধ আর জলপথ: হরমুজে সুয়েজ সংকটের পুনরাবৃত্তি?

ইরানের ওপর ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলা জেরে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বিশ্বের তেলের বাজার। তেল পরিবহনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি। এই পথেই বিশ্বের তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা পূর্বেও দেখা গেছে। গত শতাব্দীতে সুয়েজ খালের মালিকানা ও টোল আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এমনি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল বিশ্ববাসী। সুয়েজ খালের ইতিহাস: ১৮৫৮ সালে ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার ফার্দিনান্দ দে লেসেপস খালটি নির্মাণের উদ্দেশ্যে সুয়েজ খাল কোম্পানি গঠন করেন। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছর ধরে খালটির নির্মাণ কাজ চলে। ১৭ নভেম্বর ১৮৬৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে খোলে দেওয়া হয়। এটি দিয়ে জাহাজ ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগর হয়ে উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর ভারত মহাসাগরের মধ্যে সরাসরি চলাচল করে, এর ফলে দক্ষিণ আটলান্টিক এবং দক্ষিণ ভারত মহাসাগরকে এড়িয়ে চলা যায় এবং আরব সাগর থেকে লন্ডন পর্যন্ত যাত্রার দূরত্ব প্রায় ৮,৯০০ কিলোমিটার (৫,৫০০ মাইল) কমে গেছে। সুয়েজ সংকট: ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাশের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে পশ্চিমা দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতে রূপ নেয়। সংঘাত তীব্র হলে জামাল আবদেল নাশেরের নির্দেশে সুয়েজ খালে ইচ্ছাকৃতভাবে বেশ কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় মিশর। এতে খালটি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। ওই বছর অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল যৌথভাবে মিশরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডি ডি আইজেনহাওয়ার হস্তক্ষেপ করলে কয়েক দিনের মধ্যেই এই অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হয় তারা। জাতিসংঘের ভূমিকা: সংঘাত শেষে সুয়েজ খালে জাতিসংঘ জরুরি শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করে। জাতিসংঘের এই শান্তিরক্ষা মিশন ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। তবে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে এই খাল নিয়ে আবারও বিরোধ দেখা দেয়। হরমুজ প্রণালির বর্তমান প্রেক্ষাপট: বর্তমানে হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। সরু এবং স্বল্প নাব্য এই প্রণালিতে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর তেল পরিবহনকারী ট্যাঙ্কার গুলোতে হামলা চালানোর ঘোষণা দেয় ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)। শত্রু পক্ষের জাহাজে হামলা চালাতে এই জলপথে অন্তত ১০টি মাইন স্থাপন করার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বে যুদ্ধের ইতিহাসে ভৌগলিক সুবিধা সম্পন্ন দেশগুলো যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এমন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে-ভৌগলিক ওই অবস্থানের সুবিধা যেসব দেশ ভোগ করে তাদেরকে এই সংকটে সমন্নিত করা। এতে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমার পাশাপাশি শান্তি কার্যক্রম দ্রুত হয়। সূত্র: দ্য স্টেটসম্যান কেএম