এক চা দোকানির অপরাধে শত মানুষের পানির লাইন বন্ধ করল পৌরসভা!

পৌরসভার পক্ষ থেকে জনগণের জন্য স্থাপিত বিনা মূল্যের সুপেয় পানির ট্যাপকল থেকে এক চা দোকানির পানি নেয়ার ‘অপরাধে’ পুরো পানির লাইনটিই বন্ধ করে দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিবিশেষের এমন ঠুনকো অজুহাতে জনস্বার্থে স্থাপিত পানির কল বন্ধ করে দেয়ায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনাটিকে অমানবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন শহরের নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা।গত রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মহিলা কলেজ সংলগ্ন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সামনের এই পাবলিক সুপেয় পানির ট্যাপকলটি বন্ধ করে দেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় আড়াই দশক আগে (২০০০-২০০১ সালে) ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার পক্ষ থেকে পথচারীদের দুর্ভোগ কমাতে শহরের সাধারণ জনসমাগমস্থল, রাস্তার মোড়, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বেশ কিছু পাবলিক সুপেয় পানির কল (ড্রিংকিং ওয়াটার ট্যাপ) স্থাপন করা হয়েছিল। কালের গর্ভে এর বেশিরভাগই বিলীন হয়ে গেছে, দখল হয়েছে অনেক ট্যাপকলের স্থানও। তবে এর মধ্যে মহিলা কলেজ সংলগ্ন ট্যাপকলটি এত দিন চালু ছিল। প্রতিদিন কয়েকশ পথচারী এবং আশপাশের দোকানিরা এখান থেকে বোতল বা বালতিতে করে খাবার পানি সংগ্রহ করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা নিয়মিত এই পানির ট্যাপকল থেকে খাবার পানি ও নামাজের জন্য ওজুর পানি সংগ্রহ করতেন। রমজান মাসেও ইফতারের আগে এবং নামাজের সময় এই পানির কলটিতে বেশ ভিড় লেগে থাকত। এছাড়া পথচারী ও হাসপাতালের রোগীরাও এখান থেকে পানি নিতেন। কিন্তু এক চায়ের দোকানি এই কল থেকে পানি নিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করেন এবং সেখানে জটলা তৈরি হয় এমন অভিযোগে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহরে আসা পথচারী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘জনগণের জন্য স্থাপন করা পানি খাওয়ার ট্যাপটি বন্ধ করা অমানবিক। এর চেয়ে হৃদয়হীনতার কাজ আর হতে পারে না। কেউ দোষ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। এক ব্যক্তির দায় শত মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়াটা অন্যায়। জনস্বার্থে পানির ট্যাপকলটি আবারও চালু করা হোক।’ জেলা নাগরিক কমিটির সহসভাপতি নিহার রঞ্জন সরকার বলেন, ‘রাস্তার মোড়ে স্থাপিত পৌরসভার পানির লাইন সবার জন্য উন্মুক্ত। জনস্বার্থেই সেগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। এখানে চায়ের দোকানি যদি পানি নিয়ে থাকে, সেটা তার অধিকারের মধ্যে পড়ে। ফুটপাতে বসা অপরাধ হলে সেটা ভিন্ন দিক। কিন্তু চায়ের দোকানের কারণে সমস্যা হয়, এমন ঠুনকো অজুহাতে ব্যক্তির দায় সমষ্টির ওপর চাপানো ঠিক হয়নি। বিষয়টি পুরোটাই অমানবিক।’ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য আব্দুন নূর বলেন, ‘ব্যক্তির দায় সমষ্টির ওপর চাপানো ঠিক হয়নি। কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করতে পারে। আধুনিকভাবে কাঠামো নির্মাণ করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তেল উৎপাদন করায় জরিমানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির ১ নম্বর সদস্য হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন পানির অপচয় না হয়। পানি নেয়ার পর অটোমেটিক সুইচ বন্ধ হবে এমন ট্যাপ ব্যবহার করতে হবে। ব্যক্তিবিশেষের কারণে সমষ্টিগত চিন্তা না করে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া পৌর কর্তৃপক্ষের ঠিক হয়নি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর প্রশাসক মো. শরিফুল ইসলাম জানান, সুপেয় পানির ট্যাপকলটির পাশে থাকা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র থেকে তাদের জানানো হয় যে, একটি চায়ের দোকানে এই কলের পানি ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে মানুষ জটলা বেঁধে থাকে। জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি উত্থাপনের পর পৌরসভার পক্ষ থেকে পানির লাইনটি বন্ধ করা হয়। এক ব্যক্তির দায় সমষ্টিগতভাবে সবার ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পৌর প্রশাসক বলেন, ‘সেটি চালু করতে হলে আবারো সভা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ অন্যদিকে, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শিরিন সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি সুপেয় পানি বন্ধের বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ পাম্প ও নলকূপে পানি উঠছে না। পৌরসভা থেকে আর্সেনিক ও আয়রন দূরীকরণ প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হলেও রাস্তাঘাটে পর্যাপ্ত পাবলিক সুপেয় পানির কল বা 'ওয়াটার এটিএম বুথ' নতুন করে স্থাপন করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আধুনিক ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপনের মাধ্যমেই পৌরবাসীর এই সংকট দূর করা সম্ভব।