পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তি উপলক্ষ্যে উদযাপিত ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ধর্মীয় অনুভূতি, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতির এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সারা দেশে প্রস্তুতির আবহ তৈরি হয়েছে এবং নগরের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অনেকের কাছে ঈদ কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পৈতৃক বাড়িতে ফিরে বাবা মা, আত্মীয়স্বজন ও শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক আবেগঘন উপলক্ষ্য। এই ঘরে ফেরার টানই প্রতিবছর ঈদযাত্রাকে একটি বড় সামাজিক ঘটনায় পরিণত করে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এই যাত্রার পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। ধারণা করা হয়, ঢাকায় ও এর আশপাশের এলাকায় কাজ বা পড়াশোনার কারণে বসবাসকারী অন্তত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ঈদের ছুটিতে রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেন। মূল উৎসবের কয়েক দিন আগে থেকেই এই যাত্রা শুরু হয় এবং ঈদের পর কর্মস্থল ও শিক্ষাঙ্গনে ফেরার সময়ও একই প্রবাহ অব্যাহত থাকে। অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল মানুষের চলাচল দেশের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীচাপ বেড়ে যায় এবং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে দীর্ঘ যানজট, টিকিট সংকট ও যাত্রীভোগান্তির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ বছরও ঈদযাত্রাকে ঘিরে একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আজ শেষ কর্মদিবসের পর মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে টানা সাত দিনের ছুটি। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ঈদের আগের দুদিন দূরপাল্লার মহাসড়কে যানবাহনের চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে তীব্র যানজটে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোতে এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা বাজার ও অবৈধ যানবাহন স্ট্যান্ড, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি পার্কিং এবং সেতুর টোলপ্লাজায় যানবাহনের ধীরগতি চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঈদের মৌসুমেও বিভিন্ন মহাসড়কে চলমান সড়ক সংস্কারকাজ। সব মিলিয়ে এসব কারণ একত্রে যাত্রীদের ভোগান্তির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও অনেকের জন্য ঘরে ফেরার আনন্দের সঙ্গে অনিশ্চয়তার উদ্বেগ জড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ কিছু উদ্যোগও নিয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মেরামত ও সংস্কারকাজ চলছে, ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। টোলপ্লাজা ও ফেরি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে যানবাহনের গতি স্বাভাবিক রাখা যায়। একই সঙ্গে রেলপথের কিছু সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে, যাতে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হয়। হাইওয়ে পুলিশও মহাসড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই উৎসবমুখর যাত্রার উচ্ছ্বাসের আড়ালেই প্রতি বছর একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা সামনে আসে, আর তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। ঘরে ফেরার আনন্দ অনেক সময়ই কিছু পরিবারের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাত্রী অধিকারভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে যাতায়াতের সময় সারা দেশে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩২২ জন প্রাণ হারান। এই সংখ্যা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভেঙে পড়া পরিবার, অপূর্ণ থেকে যাওয়া স্বপ্ন এবং অকালেই নিভে যাওয়া বহু সম্ভাবনাময় জীবন। যারা ঈদযাত্রার পথে তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাদের কাছে আনন্দের এই উৎসব মুহূর্তেই গভীর বেদনা ও স্মৃতির ভারে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। ঈদুল ফিতর আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের এক অনন্য উৎসব। এই ঘরে ফেরার যাত্রা যেন কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্ভোগের কারণে শোক ও বেদনার স্মৃতিতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। সঠিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঈদযাত্রাকে আরও স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও শৃঙ্খলাবোধও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তখনই ঘরে ফেরার এই পথ কেবল যাত্রাপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও আনন্দের এক মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। যানজটে জর্জরিত মহাসড়ক, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণহীন যানবাহন এবং চালকদের অতিরিক্ত ক্লান্তি দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ঈদের সময় বাড়তি যাত্রীচাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক চালককে দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাতে হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না থাকায় তাদের মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা কমে যায়, যা মহাসড়কের উচ্চগতির পরিবেশে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত গতি, ট্র্যাফিক নিয়ম অমান্য করা এবং সড়কে শৃঙ্খলার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার সড়ক দুর্ঘটনা কমানো ও যাত্রীদের দুর্ভোগ হ্রাসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে আন্তঃজেলা যানবাহনের চালকদের দিনে একটানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো উচিত নয়, কারণ দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চালকের মনোযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে বাস মালিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চালক নিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে কোনো চালককে নির্ধারিত সময়ের বেশি গাড়ি চালাতে না হয়। পাশাপাশি ঈদের সময় মহাসড়কে জীর্ণ ও অচলপ্রায় বাস চলাচল বন্ধ রাখার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সমস্যার সমাধান কেবল চালকদের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পরিবহন মালিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সড়কে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও অযোগ্য যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ট্র্যাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন মালিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। লাভের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য যে অনেক বেশি, এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং চালকদের জন্য সুষ্ঠু কর্মসূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া, প্রয়োজনে অতিরিক্ত চালক নিয়োগ করা এবং যানবাহনের নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করা সড়ক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতনতাও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিরাপদ পরিবহন বেছে নেওয়া, অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত যানবাহন এড়িয়ে চলা এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশের ঈদযাত্রাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বদলানো অসম্ভব নয়। তবে তা সম্ভব হবে তখনই, যখন পরিকল্পনা হবে তথ্যভিত্তিক, বাস্তবায়ন হবে সুশৃঙ্খল এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, উন্নত সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকি থাকলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভাড়া প্রতিরোধ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করা মোটেও কঠিন নয়। নতুন সরকার যদি এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে ঈদযাত্রা কেবল ভোগান্তির নয়, বরং নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে। ঈদুল ফিতর আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের এক অনন্য উৎসব। এই ঘরে ফেরার যাত্রা যেন কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্ভোগের কারণে শোক ও বেদনার স্মৃতিতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। সঠিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঈদযাত্রাকে আরও স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও শৃঙ্খলাবোধও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তখনই ঘরে ফেরার এই পথ কেবল যাত্রাপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও আনন্দের এক মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে। লেখক: কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com এইচআর/এমএস