নোনাজলে ফিকে উপকূলের ঈদ আনন্দ

মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শেষে দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। দেশজুড়ে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। ঘরে ঘরে নতুন পোশাক আর মিষ্টান্নের আয়োজন। কিন্তু আনন্দ আর উৎসবের এই চিরাচরিত ছবিটা সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে এসে একদম বদলে যায়। এখানে নোনা বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে কেবলই বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ আর জীবিকার সংকটে থাকা হাজারো মানুষের কাছে ঈদ মানেই যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের নাম শুনলে এখনো আঁতকে ওঠেন অনেকে। ২০২০ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আম্পান আর পরবর্তী বছর ইয়াসের তাণ্ডব এই জনপদের মানচিত্রই বদলে দিয়েছে। খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারে বেড়িবাঁধ ভেঙে যখন নোনা জল লোকালয়ে প্রবেশ করেছিল, মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় সাজানো ঘরবাড়ি, সবুজ ফসলের মাঠ আর সাজানো স্বপ্নগুলো। টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এলাকাটি ছিল জোয়ার-ভাটায় নিমজ্জিত। প্রতিদিন দুবার লোনা পানিতে ডুবতো আর ভাসতো মানুষের ভিটেমাটি। সেই লোনা জলের ক্রমাগত ঝাপটায় শতশত পরিবারের মতো পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে আলমগীর হোসেনের পৈতৃক ভিটে।যেখানে এক সময় ছিল গোয়াল ভরা গরু আর ধানের গোলার সচ্ছলতা, আজ সেখানে কেবলই নদীর করাল গ্রাস। ভিটেমাটি হারিয়ে আলমগীর হোসেন এখন আশ্রয় নিয়েছেন বেড়িবাঁধের ওপর টিন, পলিথিন আর বাঁশের তৈরি এক চিলতে খুপড়ি ঘরে। নোনা বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া সেই ঘরে বসে তিনি যখন ফেলে আসা দিনের কথা ভাবেন, তখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয় উপকূলের আকাশ। আলমগীর হোসেন বলেন, নদী আমাদের শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি, আমাদের সম্মান আর স্বপ্নগুলোকেও নোনা জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। এক সময় আমরা অন্যকে সাহায্য করতাম, আর আজ এক বাটি সেমাইয়ের জন্য অন্যের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। আসন্ন ঈদ নিয়ে আলমগীরের কোনো পরিকল্পনা বা উচ্ছ্বাস নেই। তার কাছে নতুন পোশাক এখন বিলাসিতা, আর ঈদের আনন্দ মানে স্রেফ এক মুঠো অন্ন সংস্থান। বেঁচে থাকাই যেখানে বড় উৎসব শুধু আলমগীর হোসেন নন, প্রতাপনগর ইউনিয়নের বন্যতলা বেড়িবাঁধের ওপর এমন হাজারো পরিবার এখন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। নড়বড়ে এই বাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে ঝুলে আছে তাদের অস্তিত্ব। প্রতিদিনই তাদের লড়াই চলে নদী আর নোনাজলের সঙ্গে। ফলে এই জনপদে উৎসবের রঙের চেয়ে টিকে থাকার সংগ্রামটাই এখন চরম বাস্তবতা। বন্যতলা বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া নুর জাহান বলেন, নদী আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আগে নিজেদের উঠানে ঈদের নামাজ শেষে সেমাই-ফিরনি খেতাম। আর এখন জোয়ারের পানি বাড়লে চুলা জ্বলে না। ঈদের দিন সন্তানদের একটু মিষ্টিমুখ করাবো, সেই সামর্থ্যও সৃষ্টিকর্তা আমাদের রাখেননি। আমাদের কাছে ঈদ মানে কেবল আরও একটা দিন বেঁচে থাকার লড়াই। এখন অন্যদের দিকে মুখ চেয়ে থাকতে হয়। উৎসবের এই আবহে সবথেকে বেশি বিপাকে উপকূলের শিশুরা। প্রতাপনগরের পিতৃহীন শিশু জাহিদ বলে, বাবা থাকলে হয়তো এবারও নতুন জামা কিনে দিতো। কিন্তু এখন মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পান, তা দিয়ে আমাদের চালই কেনা হয় না। ঈদের দিন অন্য বন্ধুদের নতুন জামা পরা দেখলে খুব কষ্ট হয়, কিন্তু আমি তো জানি আমাদের কেনবার সামর্থ্য নেই। বাজার দরের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ উপকূলের অভাবি মানুষের কাছে ঈদ এখন এক বিষণ্ন মরীচিকা। আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বাজারে দু’বেলা খাবার জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম বলেন, বাজারে চাল-ডালের যে দাম, তাতে আমাদের মতো মানুষের না খেয়ে থাকাই ভালো। পকেটে টাকা নেই, তার ওপর জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। সন্তানদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। একই এলাকার প্রবীণ শামছুর রহমান বলেন, এক সময় আমরা সুন্দরবনের মাছ আর খেতের ধান দিয়ে সচ্ছল ছিলাম। কিন্তু নোনা পানি সব শেষ করে দিয়েছে। কর্মসংস্থান নেই, এলাকায় কোনো কাজ নেই। অভাবের এই বাজারে ঈদ এখন আমাদের জন্য এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী বেড়িবাঁধ আর সম্মানের সঙ্গে বাঁচার মতো কাজ চাই। ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান স্থানীয় সমাজকর্মী মাসুম বিল্লাহ বলেন, প্রতি বছর ঈদের আগে কিছু চাল বা শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়, কিন্তু এতে কি দারিদ্র্য দূর হয়? লোনা পানির কারণে কৃষি জমি নষ্ট হওয়ায় মানুষ এখন দিশাহারা। এদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান এবং স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। একই সুরে সমাজকর্মী আরেফিন মুন্না বলেন, ত্রাণ দিয়ে এদের সাময়িকভাবে শান্ত রাখা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া হচ্ছে না। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে না পারলে এই জনপদ অচিরেই জনশূন্য হয়ে পড়বে। বরাদ্দ কম থাকায় বিপাকে জনপ্রতিনিধিরা বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমার ইউনিয়নে কয়েক হাজার পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। কিন্তু সেই তুলনায় এবার সরকারি বরাদ্দ গত বছরের চেয়েও কম। ইচ্ছা থাকলেও সবাইকে আমরা ঈদের আনন্দটুকু দিতে পারছি না। দ্বীপ এলাকা গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি এম মাসুদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, বরাদ্দ কমে যাওয়ায় আমাদের হাত-পা বাঁধা। আমরা চাই সরকার এই বিশেষ অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করুক। সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। চাহিদা অনেক বেশি থাকলেও আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে বরাদ্দ পৌঁছে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, টিসিবি বা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বা কাউন্সিলরের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। বয়স্ক, বিধবা বা প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যাবে। যেকোনো তথ্যের জন্য সরাসরি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ বা সরকারি হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করা যাবে। নতুন ভোরের অপেক্ষায় উপকূল সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে যেতে পারে। তবেই হয়ত কোনো এক ঈদে এই মানুষগুলোর ঘরেও ফিরবে উৎসবের প্রকৃত আনন্দ। নোনা জলের দীর্ঘশ্বাস মুছে গিয়ে সাতক্ষীরা উপকূলে নতুন ভোরের সূর্য উঠবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। আহসানুর রহমান রাজীব/এমএন/এমএস