নেত্রকোনার বারহাট্টায় প্রতিবেশী এক যুবকের ধর্ষণের শিকার হয়ে সাত বছরের এক শিশু তার মাতৃত্ব হারিয়েছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা শিশুটির দরিদ্র পরিবারকে হুমকি দিয়ে অবরুদ্ধ রাখে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এলাকাবাসী এই নির্মম ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। মানবাধিকার সংস্থা বলছে, বিচার না হলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আরও বাড়বে।যে বয়সে একটি শিশুর ভয়ভীতিহীন শৈশব কাটানোর কথা, সেই বয়সে মাতৃত্ব হারাতে হলো সাত বছরের শিশুকে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় দিনমজুর বাবার সাত বছরের মেয়ে সবেমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। প্রতিবেশী নূরজামাল মিয়া তাকে ধর্ষণ করে। ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শিশুটির পেটে ব্যথা শুরু হলে তার বাবা-মা তাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করান। পরে জীবিকার তাগিদে পরিবার ঢাকায় বসবাস শুরু করে। সেখানে শিশুটির পেটে ব্যথা অব্যাহত থাকায় ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ধর্ষণের বিষয়টি শনাক্ত করেন। আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে হোটেল শ্রমিক গ্রেফতার এরপর ৩ মার্চ মাথা ব্যথা ও বমি হলে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে অভিযুক্ত নূরজামালের নাম জানায়। পরদিন ৪ মার্চ অবস্থার অবনতি হলে শিশুটিকে বাঁচাতে জরায়ু ফেলে দিতে হয়। মামলা করতে এলাকায় গেলে অভিযুক্ত ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা ১১ মার্চ শিশুটির পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে এবং রাতে থানায় মামলাটি নেয়। ভুক্তভোগী পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘সকাল থেকে থানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু অনেক মানুষ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরে থানায় ফোন করলে পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়।’ স্থানীয়রা বলছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করা হোক। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় একের পর এক লোমহর্ষক অপরাধের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নারী প্রগতি সংঘের ব্যবস্থাপক ও মানবাধিকার কর্মী সুরঞ্জিত ভৌমিক। তিনি জানান, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা এই উপজেলাকে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তার মতে, এই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয় গৃহকর্মী মারুফা হত্যার সঠিক বিচার না হওয়ার পর থেকে। সম্প্রতি একজন প্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে মা হওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের শৈশব হারিয়েছে। সুরঞ্জিত ভৌমিকের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যার ফলে অপরাধের মাত্রা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখন গ্রামের কোনো শিশুই আর নিরাপদ নয়। আরও পড়ুন: নওগাঁয় শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক আটক তিনি গত ৬ মার্চের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। সেদিন এক মা তার ৯ বছরের শিশুকে ঘরে খাবার দিয়ে ছাগল আনতে যান। ফিরে এসে দেখেন শিশুটির প্যান্ট মাটিতে পড়ে আছে এবং তার দেহ ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে। এ ধরনের একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটলেও আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীদের মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। তিনি অবিলম্বে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অন্যদিকে, এই ধর্ষণে শিশুর মাতৃত্ব হারানোর ঘটনার প্রেক্ষিতে বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হাসান জানান, পুলিশ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য নেত্রকোনা হাসপাতালে এবং আইনি প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামি কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। যদিও মামলা হওয়ার খবর পেয়ে আসামি আগেই পালিয়ে গেছে, তবে তাকে দ্রুত আটকের চেষ্টা চলছে। জেলা পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, চলতি মাসেই বারহাট্টা উপজেলায় শিশু নির্যাতনের মোট তিনটি ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া, জেলায় গত ১১ মাসে ৬৯টি ধর্ষণ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।