হরমুজ সংকটেই ফাঁস মার্কিন জোটের আসল চিত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা এখন তৃতীয় সপ্তাহে পড়েছে এবং ইতোমধ্যেই এই দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে এই সংঘাতের বড় প্রভাবগুলো—যেমন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে দূরত্ব বাড়া এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা—এসব বিষয় এখনও মূলত বিশেষজ্ঞদের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।কিন্তু যে সমস্যাটি বিশ্বের সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে, সেটা হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়া। ইরানের সামরিক বাহিনীর বিশেষ শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কার্যত বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথটিতে অবরোধ তৈরি করেছে। প্রণালীটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট, যার মাধ্যমে বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল রফতানি হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগেই আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়ছিল। এখন ইরানি ড্রোন ট্যাংকারে হামলা করতে পারে—এই আশঙ্কায় বাজারে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক এরই মধ্যেই সতর্ক করেছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এমনটা হলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করলেও বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে পারস্য উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়লে তার প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য দেন, যেখানে তিনি অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে সহায়তা করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে যেসব দেশ উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, মূলত তাদের উদ্দেশ্যেই ছিল এই বার্তা। আরও পড়ুন: পারমাণবিক অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, হরমুজ প্রণালীতে নতুন প্রোটোকল প্রয়োজন: ইরান রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অনেক বিশ্লেষক এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের কথা বললেও ট্রাম্প আসলে স্বীকার করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়ে তিনি মূলত নিজের সিদ্ধান্তের ফল সামলাতে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ বিষয়টিকে আরও পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এমনকি চীনের মতো দেশগুলোকে—যারা সরাসরি এই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদেরও এই পরিস্থিতিতে টেনে আনার চেষ্টা হতে পারে। এতে সংকটের পরিধি আরও বড় আকার নিতে পারে। খবরে বলা হচ্ছে, ডনাল্ড ট্রাম্পেরর এই আহ্বানে জাপান সরকার ইতোমধ্যেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে। টোকিও সাধারণত ওয়াশিংটনের অনেক বিষয়ে সমর্থন দেয়, কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপে তারা কম আগ্রহী যেখানে বাস্তব খরচ বা সামরিক ঝুঁকি জড়িত থাকতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্ররাও এতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। উদাহরণ হিসেবে নরওয়ে দ্রুতই জানিয়ে দিয়েছে, তারা পারস্য উপসাগরে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় কোনো নৌবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না। আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালীতে সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স: ম্যাক্রোঁ এই অনীহা অবাক করার মতো নয়। নরওয়ে বিশ্বের বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি এবং তাদের অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই তেল ও গ্যাস থেকে আসে। তাই জ্বালানির দাম বাড়া তাদের জন্য খুব একটা খারাপ খবর নয়। একইভাবে অন্যান্য জ্বালানি উৎপাদনকারী বা জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোরও এই সংকট নিয়ে সতর্ক থাকার নিজস্ব কারণ রয়েছে। বাস্তবে অন্যান্য দেশকে ট্রাম্পের আহ্বানটি যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বিষয়টি ততটা সরল নয়। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন, বিশেষ করে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে, বড় ধরনের শক্তির প্রদর্শন করা এবং দায়িত্ব অন্যদের ওপর ভাগ করে দেয়া—এই দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সহজভাবে বললে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন: ‘আমরা পরিস্থিতি তৈরি করেছি, এখন এর ফল সামলাতে অন্যরাও এগিয়ে আসতে পারে।’ ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো পারস্য উপসাগরে জাহাজ পাঠাবে কি না—এই আলোচনা শুরু হওয়াটাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গুরুত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। এতে এমন একটা ধারণা জোরদার হয় যে, বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হলো যুক্তরাষ্ট্র, যার সিদ্ধান্তে অন্য দেশগুলোকে প্রতিক্রিয়া জানাতেই হয়। অন্যভাবে বললে, মার্কিন নীতির প্রভাব পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এটাকেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ঠিক তার স্বভাবসুলভ আচরণই করছেন। তার রাজনীতির ধরনই হলো সবকিছু নিয়ে দরকষাকষি করা। তাই হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখতে অন্য দেশগুলোকে আহ্বান জানানোকে সরাসরি দুর্বলতার লক্ষণ বলা যায় না। বরং এটি এমন এক বাস্তববাদী (লেনদেনভিত্তিক) কৌশল, যেখানে প্রতীকী বিষয়গুলোর চেয়ে বাস্তব লাভ-ক্ষতির হিসাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালী দিয়ে আরও জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান এখানেই এসে একটি আরও গভীর প্রশ্ন সামনে আসে। আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি শুধু শক্তি প্রদর্শনের ওপর নয়, প্রতীক বা ভাবমূর্তির ওপরও অনেকটা নির্ভর করে। দেশগুলো নিজেদের শক্তির স্বীকৃতি চায় এবং এমন একটি নেতৃত্বের ছবি তৈরি করে, যাতে অন্যরা তাদের সম্মান ও গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এই প্রতীকী দিকটি স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রত্যাশাও তৈরি করে। যত বেশি একটি দেশ নিজেকে বিশ্ব রাজনীতিতে অপরিহার্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, ততই অন্য দেশগুলো তার কাছ থেকে সেই অনুযায়ী আচরণ করার আশা করে। এখানেই একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একটি দেশ একদিকে তার শক্তির জন্য স্বীকৃতি ও সম্মান চায়, কিন্তু বাস্তবে তার হয়তো মিত্রদের তেমন প্রয়োজনই নেই। এই টানাপোড়েনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তখন, যখন কোনো শক্তিশালী দেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও অনুভব করে—যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ক্রমেই দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারে ন্যাটো মিত্রদের দরকার হয় না। এমনকি তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনও অপরিহার্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধরনই বদলে দিয়েছে। আরও পড়ুন: আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার / কেশম দ্বীপ: ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র দুর্গ ও ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় এতে একটি কম বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আসে: প্রকৃত জোট সাধারণত সমান শক্তির দেশগুলোর মধ্যেই গড়ে ওঠে। যখন এক পক্ষ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, তখন সেই সম্পর্ক আর প্রচলিত অর্থে জোট থাকে না, বরং এক ধরনের সহযোগিতায় পরিণত হয়। এই সহযোগিতার ধরন ভিন্ন হতে পারে। কখনও এটি তুলনামূলক সম্মানজনক হতে পারে—যেমন রাশিয়ার সঙ্গে কিছু সাবেক সোভিয়েত দেশের সম্পর্ক। আবার কখনও এটি স্তরভিত্তিক বা কর্তৃত্বমূলক হতে পারে—যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনেক পশ্চিমা মিত্রের সম্পর্ক। তবে কোনো ক্ষেত্রেই এটি আগের যুগের ভারসাম্যপূর্ণ জোটের মতো নয়। বর্তমান বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই যার টিকে থাকা পুরোপুরি আরেকটি শক্তির সঙ্গে প্রচলিত জোটের ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর কৌশলগত সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে প্রায় অকল্পনীয়। তবুও এই শক্তিগুলো এখনো অন্য দেশগুলোর মধ্যে নানা প্রত্যাশা তৈরি করে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায়। গত দুই দশকে তারা বিশ্বজুড়ে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বাড়িয়েছে। আরও পড়ুন: কিছু দেশ সহায়তা করতে আগ্রহী নয়, যাদের বহু বছর সাহায্য করেছি: ট্রাম্প ফলে এখন অনেক দেশই ধরে নেয়, সংকটের সময় বেইজিং তাদের হয়ে এগিয়ে আসবে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—চীন কেন ভেনেজুয়েলার সরকারকে চাপ থেকে রক্ষা করেনি, বা কেন কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ভাঙে না। আসলে এসব প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দেশই নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। গত কয়েক দশকে ওয়াশিংটন তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে ঘিরে নানা ধরনের প্রত্যাশার একটি জটিল কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তারা ধীরে ধীরে সেই কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। অদ্ভুতভাবে এটা হয়তো খারাপ কিছু নয়। এমন একটি বিশ্ব, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রতীকী ধারণার বদলে বাস্তব কাজের ওপর বেশি নির্ভর করবে, সেটি হয়তো আরও স্থিতিশীল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ছিল, সেটি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর জায়গায় যে চিত্রটি গড়ে উঠতে পারে, তা আরও সহজ—একটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে দেশগুলো খোলাখুলিভাবে নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করবে এবং ‘বিশ্বের অভিভাবক’ নিয়ে বিভ্রম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। মূল লেখা: টিমোফে বোর্দাচেভ, ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর