ঈদের পর মন্দা কাটিয়ে গতি ফিরবে শেয়ারবাজারে, আশায় বিনিয়োগকারীরা

স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের শেয়ারবাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরবে—এমন প্রত্যাশায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনে নিম্নমুখী প্রবণতা, সূচকের ওঠানামা এবং আস্থার ঘাটতির মধ্যেও বাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদের পর নতুন করে গতি ফিরে পাবে পুঁজিবাজার। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের আগে অনেক বিনিয়োগকারী ব্যক্তিগত খরচ মেটাতে শেয়ার বিক্রি করায় বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে সূচক ও লেনদেন উভয়ই কমে যায়। প্রতিবছর ঈদ ঘিরে এমন প্রবণতা দেখা গেলেও ঈদের পর ধীরে ধীরে বাজারে তারল্য ফিরে আসে। তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধের মধ্যেও এবার ঈদের আগে শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যা বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। এখন ঈদের পর কিছুদিন বাজার ভালো থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তখন বাজারে তারল্যও বাড়বে। বাড়বে লেনদেনের গতিও। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, ঈদের পর শেয়ারবাজারে স্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকবে। কারণ, নতুন অর্থবছরকে সামনে রেখে বিভিন্ন কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও লভ্যাংশ ঘোষণা করবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজার ছেড়ে যাচ্ছিলেন বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা। চলতি মার্চ মাসে তাদের সেই প্রবণতা থেমেছে। নতুন করে শেয়ারবাজারে ফিরতে শুরু করেছে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসের ১২ কার্যদিবসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বেড়েছে ৫৫টি। অর্থাৎ, প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৪টির বেশি বিদেশি ও প্রবাসী বিও হিসাব বেড়েছে। এই ১২ কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৩ হাজার ১৬টি। অর্থাৎ, প্রতি কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে গড়ে ২৫১টির বেশি। বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারবাজারও মোটামুটি ইতিবাচক আচরণ করেছে। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে শেয়ারবাজারে কিছুদিন টানা দরপতন হয়। অবশ্য ঈদের আগে শেষ কার্যদিবসে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি সবকটি মূল্যসূচক বেড়েছে। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেষ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬ কার্যদিবস শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিপরীতে ১৪ কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে দরপতন হয়। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে বেশ অস্থিরতা দেখা গেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত টানা ছয় কার্যদিবস দরপতন হয়। এই ছয়দিনে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমে ৫৯২ পয়েন্ট। এমন পতনের পর ঈদের আগে শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা দেওয়ায় শেষ ৩০ কার্যদিবসে সার্বিকভাবে বাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে বলা চলে। কারণ, শেষ ৩০ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ২০০ পয়েন্ট। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি এই সময়ে বাজার মূলধনেও উন্নতি হয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮১ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, শেষ ৩০ কার্যদিবসে বাজার মূলধন বেড়েছে ১০ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। মিজানুর রহমান নামের একজন বিনিয়োগকারী জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেয়ারবাজার যখন গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা করে বসে। ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই যুদ্ধ বাঁধার পর শেয়ারবাজারে টানা দরপতন হয়। তবে ঈদের আগে বাজার কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আমরা আশা করছি, ঈদের পরও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। মো. মামুন নামের আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, নির্বাচনের পর বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও, সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীরা এখনো বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ মন্দার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ লোকসান বহন করছেন। এসব বিনিয়োগকারী হয়তো এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। তবে টানা কিছুদিন বাজার ইতিবাচক থাকলে লোকসান কিছুটা কমে আসবে। আমাদের একটাই চাওয়া ঈদের পর যেন শেয়ারবাজার ইতিবাচক ধারায় থাকে। জব্বার নামের একজন বিনিয়োগকারী বলেন, আমাদের মতো বিনিয়োগকারী সবসময় চাই বাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকুক। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। বরং বেশিরভাগ সময় বাজারে দরপতন হচ্ছে। এখন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। টানা কিছুদিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলে বিনিয়োগকারীদের লোকসান কমে আসবে। আমরা চাই, ঈদের পর যেন শেয়ারবাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে। তিনি বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা সবসময় বেশি থাকে। কিন্তু সূচক বা লেনদেনের গতিপথে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা কম থাকে। বড় ও প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বড় ও প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যদি সক্রিয় থাকেন, তাহলে বাজার ইতিবাচক প্রবণতায় ফিরবে বলে আমরা আশা করছি। জানতে চাইলে ডিএসইর একজন পরিচালক জাগো নিউজকে বলেন, ভবিষ্যতে শেয়ারবাজার ইতিবাচক, নাকি নেতিবাচক ধারায় থাকবে তা আগাম বলা মুশকিল। যে কোনো ঘটনা বাজারের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তবে ইরান যুদ্ধ বাদে এখন বাজারের সব ইন্ডিকেটর ইতিবাচক। তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম এখন বিনিয়োগের উপযুক্ত। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাও নেই। তাই আশা করা যায় শেয়ারবাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। এমএএস/এমকেআর