অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০২৬ সালের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হবে। সময় গড়িয়েছে, ঈদ এখন দুয়ারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, গত এক বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফিরতে পারেনি মিয়ানমার-এ।প্রত্যাবাসনে নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। উল্টো নতুন করে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজার-এ। তবে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, মানবিক সংকট আর ভবিষ্যতহীনতার মাঝে আটকে থাকা এই মানুষগুলো এখনো আশায় বুক বাঁধছে নতুন সরকারের উদ্যোগে হয়তো খুলবে প্রত্যাবাসনের পথ, ফিরবে নিজ ভূমিতে নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন।ইফতার সামনে রেখে লাখো রোহিঙ্গার উপস্থিতি, পাশে জাতিসংঘ-এর মহাসচিব। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ, উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সেই সমাবেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস দিয়েছিলেন বড় প্রতিশ্রুতি- ২০২৬ সালের ঈদ হবে নিজ দেশ মিয়ানমার-এ।রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বক্তৃতা দেন প্রধান উপদেষ্টা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুঃখ দেখে সমাধান করতে জাতিসংঘ মহাসচিব এসেছেন। এই ঈদে না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ঈদ করতে পারবেন, সেই প্রত্যাশা করি।’তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে সারা দুনিয়ার সঙ্গে প্রয়োজনে লড়াই করতে হবে। ঈদে মানুষ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গাদের সেই সুযোগও নেই।আরও পড়ুন: ২০২৪ সালের পর নতুন করে রোহিঙ্গা এসেছে ১ লাখ ৪৪ হাজারএ ঘোষণায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন কক্সবাজার-এর ৩৩টি ক্যাম্পে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও নেই প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। উল্টো গত ১৫ মাসে নতুন করে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্প-১ এর বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াজ (৩০) বলেন, ‘গত বছরের রমজানে ড. মুহাম্মদ ইউনুস এবং আন্তোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এলে আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। বিশ্বে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিজে এসে আমাদের মতো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর খোঁজ নিয়েছেন-এটা আমাদের জন্য বড় পাওয়া ছিল। সেই সময় ড. ইউনুসের ঘোষণায় আমরা আরও আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ সালের ঈদ আমরা নিজ দেশ মিয়ানমার-এ উদযাপন করতে পারব। কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৬ সালের ঈদ চলে এসেছে-ড. ইউনুস আছেন যুক্তরাষ্ট্র-এ, আর আন্তোনিও গুতেরেস গেছেন জেনেভা-য়। অথচ আমরা রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশ-এর শরণার্থী ক্যাম্পেই রয়ে গেছি।’আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনুস ঘোষণা দিয়েছিলেন-২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি আরাকান-এ উদযাপন করতে পারবে। এমনকি সেখানেই ফিরে গিয়ে মা-বাবার কবর জিয়ারত করার সুযোগও হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।’তিনি বলেন, ‘এ ঘোষণায় রোহিঙ্গাদের মাঝে এতটাই আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, কষ্ট-দুঃখ ভুলে গিয়েছিল তারা। কিন্তু সময় গড়ালেও সেই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।’এদিকে গত ৮ বছরে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও আশার আলো দেখছেন আশ্রিতরা।ক্যাম্প-১৮-এর বাসিন্দা আব্দুল হাই (৪৬) জানান, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশ-এ আশ্রয় নেন তিনি।তিনি বলেন, ১৯৯১-৯২ সালে যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, সেই সময় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে নতুন সরকারকে ঘিরে তাদের মাঝে আবারও আশার সঞ্চার হয়েছে।আব্দুল হাইয়ের প্রত্যাশা, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে একদিন তারা নিজ ভূমি রাখাইনে ফিরে যেতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে-এমনটাই বিশ্বাস করছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা।আরও পড়ুন: তহবিল সংকটে ঝুঁকিতে রোহিঙ্গাদের এলপিজি সরবরাহসচেতন মহলের মতে, বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এটি ছিল বড় একটি সুযোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগ ছিল প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান বক্তব্যে তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন হলেও, সেই বক্তব্যের এখনো কোনো বাস্তব ফলাফল দেখা যায়নি এবং ভবিষ্যতেও তা কতটা কার্যকর হবে-তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।তিনি বলেন, বর্তমান নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের যদি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর উদ্যোগ থাকে, তাহলে কিছু ইতিবাচক ফল আসতে পারে। তবে আপাতত দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় এ বিষয়ে খুব বেশি আশা দেখছেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।এদিকে ক্যাম্পগুলোতে বাড়ছে সংকট। জ্বালানি ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকটও। যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলছে।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন ইস্যুতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই; বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন-এ সংঘাত বেড়েছে-সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মি-এর মধ্যে চলমান লড়াইয়ের ফলে সেখানে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও নির্যাতনের মুখে এলাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। এমনকি সীমান্ত এলাকাতেও নতুন করে রোহিঙ্গা জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বাণিজ্যে তুরস্কের জোরালো সমর্থন চায় বাংলাদেশতিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার-এর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি এখনো প্রত্যাবাসনের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। পাশাপাশি সেখানে অবকাঠামো ও আর্থিক সংকটও বিদ্যমান, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।ঈদ আসে, ঈদ যায়-কিন্তু বদলায় না রোহিঙ্গাদের ভাগ্য। প্রতিশ্রুতির পরও যখন শূন্য প্রত্যাবাসন, তখন প্রশ্ন একটাই- আর কত অপেক্ষা?