আঙুলের চাপেই উঠছে অর্ধকোটি টাকার রাস্তার পিচ কার্পেটিং

ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত ও পায়ের আঙুলের চাপেই উঠছে অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পিচ ঢালাই সড়ক। দুই উপজেলার সংযোগ সড়কটি নির্মাণের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও জমাট না নেয়ায় হাত দিয়েই এভাবেই পিচ কার্পেটিং তুলে নিম্নমানের কাজের অবস্থা দেখাচ্ছেন স্থানীয়রা।চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের করিম মোড় এলাকায় দেড় কিলোমিটারের অধিক সড়কের এমন অবস্থা।স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানা যায়, দুই দিন ধরে শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের করিম মোড় থেকে সিনুর মোড় পর্যন্ত ১.৬ কিলোমিটার সড়কের পিচ কার্পেটিংয়ের কাজ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তবে পিচ কার্পেটিংয়ের কাজ চলমান অবস্থায় দফায় দফায় নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে বাধা দেয় স্থানীয় তরুণ-যুবকরা। সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হলেও পরে একইভাবে কাজ সম্পন্ন করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, মাটি ও কাদা পরিস্কার না করে তার উপরেই দেয়া হয়েছে পিচ ঢালাই। এছাড়াও পাথরে সঠিক পরিমানে দেয়া হয়নি বিটুমিন। এমনকি ধুলাবালি ও মাটি থাকা পাথরসহ দেয়া হয়েছে ঢালাই। ফলে হাতের টানে সহজেই উঠে যাচ্ছে পিচ কার্পেটিং। ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত ও সঠিকভাবে কাজ করার দাবি স্থানীয়দের।স্থানীয় বাসিন্দা তারেক রহমান সময় সংবাদকে জানান, শিবগঞ্জ উপজেলার সাথে সদর উপজেলার সংযোগের জন্য সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম হয়েছে। কয়েকদিন ধরে পিচ কার্পেটিংয়ের কাজ চলেছে। কাজ চলার সময়েও বাধা দিয়েছে গ্রামবাসী। কিন্তু তাতে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আবারও একইভাবে অনিময় করে কাজ শেষ করেছে ঠিকাদার। এলজিইডির কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ঠিকদার এমন নিম্নমানের কাজ করেছে।কলেজছাত্র ফয়সাল আজম বলেন, ১.৬ কিলোমিটার সড়কের বেশিরভাগ অংশেই ধুলাবালির উপরে পিচ কার্পেটিং হয়েছে। নতুন সড়কটির বিভিন্ন অংশ হাত-পা দিয়ে এলাকার কিশোর-তরুণরা পিচ কার্পেটিং উঠিয়ে এসব খালখন্দ করেছে। সহজেই এলাকার ছোট ছোট বাচ্চারা হাত দিয়ে চাপ দিলেই এক সপ্তাহ আগে করা পিচ কার্পেটিং উঠে যায়। ঢালাইয়ের কাজ চলমান অবস্থায় কার্পেটিং উঠা স্বাভাবিক, কিন্তু এতোদিন পরেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় তা জমাট বাঁধেনি।আরও পড়ুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হলেন সাবেক এমপি হারুনুর রশীদপঞ্চাশোর্ধ তরিকুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, ‘পুরো সড়কটির উপরে মাটি ও কাদায় পরিপূর্ণ ছিল। সেগুলো না পরিষ্কার করে তার উপরেই পিচ কার্পেটিং করা হয়েছে। আর এতেই হাত দিয়ে উঠছে অর্ধ কোটি টাকার রাস্তা। এমনকি যে পাথর দিয়ে ঢালাই দেয়া হয়েছে, সেখানে ব্যাপক ভেজাল রয়েছে। বিটুমিন কম দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বালু ধুলা মিশ্রিত পাথর দিয়ে ঢালাই দেয়া হয়েছে।’কলেজছাত্র নিসান আলী বলেন, ‘আমরা সড়ক নির্মাণকাজের স্থানে কয়েকজন তরুণ-যুবক সেখানে যায়। এরপর নিম্নমানের কাজের সন্দেহে হাত দিলে উঠে যেতে দেখা যায়। এরপর ৩-৪ দিন আগের সম্পন্ন করা কাজের জায়গাগুলোতেও গিয়ে দেখি একই অবস্থা। এসময় ফেসবুকে লাইভ করলে স্থানীয় আরও মানুষজন আসে এবং সকলে মিলে কাজ বন্ধ করি। পরে আবারো একইভাবে কাজ শেষ করা হয়েছে।’কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এমন পিচ ঢালাই সড়ক চাই না৷ আগে যা ছিল তাতেই ভালো হবে আমাদের। কোটি টাকার সড়ক যদি একদিনও না টেকে তাহলে এমন সড়ক তৈরি করার দরকার কী? আঙুলের চাপেই যদি উঠে যায়, তাহলে বড় বড় যানবহন চললে সড়কের অবস্থা কি হবে?’ধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম রাব্বানী সময় সংবাদকে বলেন, ‘ধুলার উপরেই পিচ কার্পেটিং করা হয়েছে। জনগণের পক্ষে আমি নিজেও তাদেরকে বারবার বলেছি, কিন্তু শুনেনি। এমন খারাপ কাজ অপ্রত্যাশিত। এমন কাজের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সবাই আমাকে বলছে কাজ খারাপ হয়েছে। স্থানীয়রা কাজের মান নিয়ে খুবই ক্ষিপ্ত।’এনিয়ে কথা বলতে দফায় দফায় অফিসে গেলেও বক্তব্য দিতে রাজি হননি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন। এমনকি মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। অভিযোগ অস্বীকার করে সকল নিয়ম মেনে সঠিকভাবে কাজ হয়েছে দাবি করলেও ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেননি ঠিকাদার মো. বিটন।শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে উপজেলা প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘স্থানীয়রা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পিচ কার্পেটিং তুলছে। তারপরেও যদি কোন জায়গায় কোন ধরনের সমস্যা থাকে, আামদের লোককে বলেছি, যাতে সেই জায়গাগুলো ঠিকঠাকভাবে কাজ সম্পন্ন করে। হাতের কাজে কোথাও যদি কোন ব্যতয় ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তা আমরা দেখব এবং ঠিক করে দিব। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’প্রসঙ্গত, গত ০৯ মার্চ শেষ হওয়া ১.৬ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজের নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা। গতবছরের সেপ্টেম্বরে এই সড়কের সদর উপজেলার অংশে একইভাবে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে এনিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক।