ঈদের আনন্দ হোক সবার জন্য

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের এক মহান দিন। এক মাস রমজানের সিয়াম সাধনার পর আল্লাহ তাআলা এই দিনকে মুসলমানদের জন্য পুরস্কার ও খুশির দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ঈদের আনন্দ কেবল ধনী বা স্বচ্ছল মানুষের জন্য নয়; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য  বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যেখানে ধনী-গরিব সবাই একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেবে। তাই রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম  তার জীবনে দরিদ্র মানুষের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ঈদের আনন্দ সবার জন্য কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে ইবাদত সম্পন্ন করার পর আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলেছেন।আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ যাতে তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূর্ণ করো এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য তার মহিমা ঘোষণা করো এবং কৃতজ্ঞ হও। (সুরা বকারা ২:১৮৫)  ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা লাভ করে যখন সমাজের সবাই এতে অংশ নিতে পারে। তাই কোরআনে দরিদ্র ও অভাবীদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দীদেরকে।  (সুরা দাহর:৮) এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে একজন মুমিনের প্রকৃত চরিত্র হলো নিজের আনন্দ অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া। ফিতরা  গরিবদের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ঈদের আগে ইসলামে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রদান করা ফরজ করা হয়েছে, যাতে গরিব মানুষও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে।রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম   বলেছেন,فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম  সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারকে অনর্থক কথা ও ভুল থেকে  পবিত্র করার জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।(সুনানু আবি দাউদ ১৬০৯)  এই হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ফিতরার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গরিবদের খাদ্যের ব্যবস্থা করা, যাতে তারাও ঈদের দিন আনন্দ করতে পারে।অন্য হাদিসে এসেছে, أَغْنُوهُمْ عَنِ الطَّوَافِ فِي هَذَا الْيَوْمِ ঈদের দিনে তাদেরকে (গরিবদেরকে) মানুষের কাছে ঘুরে বেড়ানো থেকে মুক্ত রাখো। (সহিহ আল জামে:১৯৮) অর্থাৎ ঈদের দিনে যেন দরিদ্র মানুষকে কারও কাছে সাহায্য চাইতে না হয় এটাই ইসলামের শিক্ষা। রসলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম গরিবদের সাথে কিভাবে ঈদ করতেন রসুুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম  ছিলেন মানবতার সর্বোচ্চ আদর্শ। তিনি ঈদের আনন্দ শুধু নিজের পরিবারে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং দরিদ্র, ইয়াতিম ও অসহায় মানুষের সাথেও ভাগ করে নিতেন।দরিদ্রদের সাহায্য করতেনরসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম  অত্যন্ত দানশীল ছিলেন, বিশেষ করে রমজান মাসে। হাদিসে এসেছে,كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম  ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, আর রমজান মাসে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। (সহিহ বুখারি:৬) রমজানের শেষে ঈদের সময় দরিদ্রদের সাহায্য করা ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। ইয়াতিম ও অসহায়দের খোঁজখবর নিতেনরসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম ইয়াতিম ও দরিদ্রদের প্রতি অত্যন্ত মমতাশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন,أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا আমি এবং যে ব্যক্তি ইয়াতিমের দায়িত্ব নেয়, জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব। (সহিহ বুখারি: ৬০০৫) এই হাদিসে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম নিজের আঙুল দুটি পাশাপাশি করে দেখিয়েছিলেন।ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশের অনুমতি দিতেন রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম চাইতেন সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করুক এমনকি গরিব মানুষও।হাদিসে বর্ণিত আছে,أنَّ أبا بَكْرٍ، دَخَلَ عَلَيْها والنبيُّ ﷺ عِنْدَها يَومَ فِطْرٍ أوْ أضْحًى، وعِنْدَها قَيْنَتانِ تُغَنِّيانِ بما تَقاذَفَتِ الأنْصارُ يَومَ بُعاثٍ، فَقالَ أبو بَكْرٍ: مِزْمارُ الشَّيْطانِ؟ مَرَّتَيْنِ، فَقالَ النبيُّ ﷺ: دَعْهُما يا أبا بَكْرٍ، إنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا، وإنَّ عِيدَنا هذا اليَوْمُ. হজরত আবু বকর রা. একদিন হজরত আয়েশা  রা-এর ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন সেখানে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন। দিনটি ছিল ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আজহার দিন। সে সময় দুইজন কিশোরী মেয়ে গান গাইছিল, যা আনসারদের মধ্যে বুআছ যুদ্ধের সময়কার কবিতা ছিল।  তখন আবু বকর রা. বললেন,এ কি  শয়তানের বাঁশি? তিনি এ কথা দুইবার বললেন। তখন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আবু বকর! তাদেরকে থাকতে দাও। প্রত্যেক জাতিরই একটি উৎসব আছে, আর আজ আমাদের ঈদের দিন। ( সহিহ বুখারি:৯৫২) এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করা, বৈধভাবে খুশি হওয়া ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ইসলামে অনুমোদিত। তবে তা অবশ্যই শালীনতা ও শরিয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে। ঈদের দিনে সমাজের প্রতি মুসলমানদের দায়িত্ব ঈদের আনন্দকে সবার জন্য নিশ্চিত করা মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ১. ফিতরা ও জাকাত আদায় করা, ফিতরা ও জাকাতের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা যায়। ২. আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া, ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বলেছেন, مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ জিবরাইল আ.আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে আমি মনে করেছিলাম তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন। (সহিহ বুখারি:৬০১৪) গরিবদের সাথে খাবার ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ঈদের দিনে দরিদ্র মানুষকে খাবার খাওয়ানো ও তাদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া একটি বড় নেক আমল।রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম বলেছেন, خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ মানুষের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে মানুষের জন্য বেশি উপকারি ঈদের প্রকৃত শিক্ষাঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো ১.ধনী-গরিবের ভেদাভেদ দূর করা ২.ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা ৩.দরিদ্রদের সাহায্য করা৪.সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা  ৫.আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যদি ঈদের দিনে পাশের ঘরের গরিব মানুষটি না খেয়ে থাকে, তবে আমাদের ঈদের আনন্দ পূর্ণ হয় না।ঈদুল ফিতর কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি মানবতা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম তার জীবনে দেখিয়েছেন কীভাবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে হয়। ফিতরা প্রদান, দান-সদকা, ইয়াতিমদের যত্ন নেওয়া এবং প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়ার মাধ্যমে ঈদের আনন্দকে সবার জন্য নিশ্চিত করা যায়। তাই আমাদের উচিত রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ অনুসরণ করে এমনভাবে ঈদ উদযাপন করা যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষ ধনী, গরিব, ইয়াতিম ও অসহায় সবাই সমানভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।