মাদারীপুরে নারীদের টার্গেট করে মাঠে নেমেছে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ বা ডেভিলস ব্রেথ চক্র। মুহূর্তেই বিশেষ এক চেতনানাশক ব্যবহার করে নারীদের ইচ্ছাশক্তি লোপ করে সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নিচ্ছে তারা। গত এক মাসে অন্তত ১০টি এমন ঘটনা ঘটলেও এ পর্যন্ত চক্রের কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর শহরের পুরাণ বাজার, রাজৈরের টেকেরহাট বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাংক থেকে বের হওয়া গ্রাহক কিংবা একাকী চলাচলকারী নারীদের টার্গেট করছে চক্রটি। মূলত ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী একদল তরুণ এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশেষ এই কেমিক্যালটি অপারেশনের পর রোগীর ব্যথা কমাতে অতি অল্প মাত্রায় ব্যবহৃত হলেও, অপরাধীরা মানুষের মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে প্রতারণা করছে। এতে ভুক্তভোগী সাময়িকভাবে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। গত ৪ মার্চ দুপুরে মাদারীপুরের চরমুগরিয়া এলাকার বাসিন্দা সাবিয়া বেগম এমন ঘটনার শিকার হন। বাজারে যাওয়ার পথে এক তরুণ নাকের কাছে চেতনানাশক পাউডার দিয়ে তার ইচ্ছাশক্তি লোপ করে। পরে তাকে একটি বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে গৃহবধূর শরীরে থাকা স্বর্ণের কানের দুল, আংটি ও নগদ টাকা নিয়ে মুহূর্তেই লাপাত্তা হয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। একই কৌশলে মধ্য খাগদী এলাকার নুরুনাহার বেগমকেও বশ করে দুষ্কৃতকারীরা। নির্জন এলাকায় নিয়ে তার কাছ থেকেও সবকিছু লুট করে সটকে পড়ে গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিকবিদিক ঘোরাঘুরি করে তিন ঘণ্টা পর বাড়িতে ফেরেন তিনি। এখনও তার অসুস্থতা কাটেনি। ভুক্তভোগী সাবিয়া বেগম বলেন, ‘আমার মাথায় হাত দিয়ে এক তরুণ ছেলে দোয়া চাইলো। এরপর চরমুগরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে আমাকে তাদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। শরীর থেকে আমার স্বর্ণালংকার ও ব্যাগে থাকা টাকা নিয়ে গেলেও আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছি। কারণ তখন ওই চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিলাম আমি। তিন ঘণ্টা পর আমি বাসায় ফিরে আসি। এই ভয়ানক চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় এনে কঠিন বিচার হওয়া উচিত।’ আরও পড়ুন: ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ডাকাতি, ৫ জন সর্বস্বান্ত আরেক ভুক্তভোগী নুরুনাহার বেগম বলেন, ‘নাকের সামনে পাউডার জাতীয় চেতনানাশক দিয়ে আমার ইচ্ছাশক্তি লোপ করে। পরে ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। এরপর সবকিছু নিয়ে লাপাত্তা তারা। আমি এক সপ্তাহ ধরে এখনও অসুস্থ। তাদের এই চেতনানাশকের কারণে ঠিকমতো মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারি না। আমি আইনের কাছে এই চক্রের বিচার চাই, যাতে অন্য কেউ আমার মতো ক্ষতিগ্রস্ত আর না হয়।’ স্থানীয় বাসিন্দা সায়েম বেপারী বলেন, ‘শয়তানের নিঃশ্বাস চক্রটি বেশ বেপরোয়া। এখনই তাদের না থামানো গেলে ক্যান্সারের মতো চারদিকে তারা ছড়িয়ে পড়বে। আমরা চাই পুলিশ-প্রশাসন এই চক্রকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক, যাতে অন্য কেউ আর এমন ফাঁদে পড়তে না পারে।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শয়তানের নিঃশ্বাস চক্র মাদারীপুরে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই চক্রকে ধরতে বাসস্ট্যান্ড, হাটবাজার ও শপিংমল এলাকায় কাজ করছে পুলিশ। সাদা পোশাকের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিগগিরই অপরাধীরা আইনের হাতে ধরা পড়বে।’ মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম জানান, এই ভয়ানক চক্রের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রথমত জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি রাস্তায় একা চলাচল না করাই উত্তম। এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সন্দেহভাজন কাউকে দেখতে পেলে নিকটস্থ থানায় খবর দিতে হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হবে বলেও জানান তিনি।