বিদায় রমজান: তাকওয়ার প্রদীপ জ্বলুক বারো মাস

রমজান বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। এই মাস রহমত মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। রমজান পেয়ে মুমিনগণ অধিক আমলে মনোযোগ দেন। দীর্ঘ ১১ মাস জাগতিক স্বপ্ন স্বাদে ডুবন্ত মানুষটিও মগ্ন হন গভীর ইবাদতে। নামাজ না পড়া মানুষটিও হয়ে যান প্রথম কাতারের মুসল্লি। বাসা বাড়ি থেকেও ভেসে আসে কুরআন তেলাওয়াতের পবিত্র সুর। পাপের কালিমা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে চলে অশ্রুবিগলিত দোয়া। জিকির, দান খায়রাত সদকাসহ  বিভিন্ন নেক আমলে কাটে দিন। দীর্ঘ সময় পানাহার ত্যাগ করার কষ্টকে কষ্ট মনে হয় না।   নিরবে চুপিসারে কোন কিছু ভক্ষণ করার কথা কল্পনাও করেন না। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সামান্য ইফতার গ্রহণ করেই নামাজের জন্য ছুটে যান মসজিদে। কিছুক্ষণ পর  আবারো সারাদিনের কর্মক্লান্তি ও অভুক্ত থাকার কষ্টকে উপেক্ষা করে শরিক হন ইশার নামাজে। তারাবিতে দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত শুনেন মুগ্ধতা নিয়ে। ঘরে ফিরে অল্প সময়ের নিদ্রা। এরপর দাঁড়িয়ে যান তাহাজ্জুদ নামাজে। কপাল বিছিয়ে দেন জায়নামাজে। গুনাহের আবরণে ঢাকা চোখ থেকে ঝরে তওবার অশ্রু। চাওয়া হয় অতীত পাপের ক্ষমা। মনে আসে পরিচ্ছন্নতা। সেহরির পর অলস শরীরটাকে বিছনায়  এলিয়ে দিতে মন চায়। তখনই ভেসে ফজরের আযানের সূর। আবার চলে যান মসজিদে। এভাবেই কাটে একজন রোজাদারের দিন রাত। এছাড়া ক্রোধ, হিংসা বিদ্বেষ ঝগড়া হানাহানিসহ অনৈতিকতার সব আঁধার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন রোজাদারগণ। এভাবে দীর্ঘ এক মাস চলে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ। সংযম আর ইবাদতের সৌরভের সজীব হয়ে ওঠে মুমিনের হৃদয়। মুমিনের সামনে খুলে যায় সফলতার সিঁড়ি। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব। মুসলিম: ২৭৬০ আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের  ওপর। যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। সূরা বাকারা : ১৮৩ মাহে রমজান তাকওয়ার প্রশিক্ষণের মাস। আর প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে হয় সারা বছর। প্রশিক্ষণে অর্জিত যোগ্যতা এবং গুণগুলো ধরে রাখতে হয় সারা জীবন। তবেই প্রশিক্ষণের সার্থকতা পুরোপুরি ফুটে ওঠে।   রমজানে যেমন আমলে আমলে কেটেছে সময় রমজানের বাহিরেও যেন তেমনি কাটে। কারণ রমজান মাসে আমরা যেমন আল্লাহর বান্দা রমজানের বাইরেও তারই বান্দা। রমজানে আল্লাহ দেখছেন এই ভাবনায় পাপাচার ও পানাহারের অনেক বৈধ কাজ থেকেও যেমন বিরত থাকা হয় অন্য মাসেও যেন এই ভাবনা জাগ্রত থাকে।  এ মাসে অনৈতিকতা কালো ধোঁয়া থেকে যেভাবে নিজেকে দূরে রেখেছি রমজানের বাইরেও যেন সকল পাপের আঁধার  থেকে নিজেকে দূরে রাখি। কারণ পাপ যে সময়ই করা হোক তা পাপই।  রমজানে যেমন গুরুত্ব সহকারে নামাজ পড়েছি রমজানের বাহিরেও তা ধরে রাখতে হবে। কেননা রোজার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নামাজ এবং এ নামাজই একজন মানুষের ঈমানদার হওয়ার আলামত।  রমজানে যেমন তেলাওয়াত জিকির দান খয়রাত করেছি বাকি মাসগুলিতেও তা ধরে রাখতে হবে। রমজানের মত অন্য মাসগুলোতেও আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টা শুধু রমজানের সাথেই খাস নয়। বরং সারা বছরই আল্লাহর দিকে ছুটে চলা অব্যাহত রাখতে হবে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, কোন বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। যদি কোন বান্দা আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে চার হাত অগ্রসর হই। আর যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি। সহীহ মুসলিম: ২/৩৪১ তাই রমজানের পরেও  ইবাদতের স্পৃহা অব্যাহত থাকুক।  আমাদের জীবন জুড়ে আসুক রমযানের প্রভাব।  তাহলে আল্লাহর রহমতে সিক্ত হতে পারব।  তাকওয়ার রঙে রঙিন হবে জীবন। প্রশান্তিতে ভরে উঠবে জীবন। লেখক: শিক্ষক, শেখ জনূরুদ্দীন র  দারুল কুরআন চৌধুরীপাড়া মাদরাসা, ঢাকা-১২১৯