শেরপুরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির তালিকায় অন্যতম ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’। একসময় কেবল শরৎকালে এটি তৈরি করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন রমজান মাসেও ব্যাপকভাবে তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে। ভোজনরসিক বাঙালির ইফতার মানেই বাহারি রকম ও স্বাদের খাবার। খুরমা-খেজুর, ফলমূল, মুড়ি, পেঁয়াজু, বুন্দিয়া কিংবা লাড্ডুর সঙ্গে শেরপুরের রোজাদারদের কাছে আলাদা কদর রয়েছে বিশেষ এই জিলাপির। শেরপুরের ঘোষপট্টির মিষ্টি ব্যবসায়ী ও কারিগররা জানান, প্রায় ১৫০ বছর ধরে মাষকলাইয়ের আমিত্তি তৈরি হয়ে আসছে। ব্রিটিশ শাসনামলেও এই অঞ্চলের জমিদারদের আপ্যায়নে ব্যবহৃত হতো মাষকলাইয়ের আমিত্তি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব ও ভাইফোঁটা উৎসবে এই মিষ্টির চাহিদা বেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোজাদারদের চাহিদার কারণে স্বাধীনতার পর থেকে রমজান মাসে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে আমিত্তি। শহরের ঘোষপট্টির দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার, রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভান্ডার, নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার, প্রেমানন্দ গ্র্যান্ড সন্স, শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ বিভিন্ন দোকানে এই মিষ্টি পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতিকেজি আমিত্তি বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩৫০ টাকা দরে। ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান মাসে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয় আমিত্তি। শেরপুর পৌর শহরের ঘোষপট্টি এলাকায় মিষ্টির দোকানগুলোতে দেখা যায়, দুপুর ১২টা থেকে মাষকলাইয়ের আমিত্তি তৈরির কাজ শুরু হয়। দুপুর থেকে গরম তেলে ভেজে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিকেল থেকে শহরের ঘোষপট্টির মিষ্টির দোকানগুলোতে ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’ কেনার জন্য ক্রেতাদের ভিড় লেগে যায়। কারিগররা জানান, মাষকলাইয়ের আমিত্তির প্রধান উপকরণ হলো মাষকলাইয়ের ডাল। প্রথমে কাঁচা মাষকলাইয়ের ডাল কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর মেশিন বা পাটায় বেটে নেওয়া হয়। এরপর সামান্য কিছু চালের গুঁড়া এবং বেসন মিশিয়ে আমিত্তি তৈরির মূল উপাদান তৈরি করা হয়। এরপর কাপড়ের মধ্যে ওই মণ্ড রেখে গরম তেলের মধ্যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই মিশ্রণ দিয়ে বিশেষ ছাঁচে কাঁচা আমিত্তি তৈরি করে তেলে ভাজা হয়। পরে ভাজা আমিত্তিগুলো চিনির তৈরি রসে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। এরপর এই আমিত্তি বিক্রি উপযোগী হয়। ঘোষপট্টির দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক সঞ্জয় চন্দ্র ঘোষ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এই আমিত্তি তৈরি করতাম পূজায়। কিন্তু চাহিদার বিবেচনায় রমজানে প্রচুর তৈরি করতে হয়। আড়াইশ টাকা থেকে বিক্রি শুরু। সব উপকরণের দাম বেশি, তাই কেজিপ্রতি দাম এবার একটু বেশি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘোষপট্টি এলাকায় ৮-১০টি মিষ্টির দোকানে মাষকলাইয়ের ডালের আমিত্তি তৈরি করা হয়। এ আমিত্তি সব জায়গায় পাওয়া যায় না বলে জেলায় এর চাহিদাও ব্যাপক।’ সঞ্জয় চন্দ্র ঘোষ আরও বলেন, ‘আমার দাদা বলেছেন, ইংরেজ জমিদারদের আপ্যায়নে এসব আমিত্তির অর্ডার দেওয়া হতো। সেসময়ে তারা এগুলো সরবরাহ করতেন।’ মাষকলাইয়ের আমিত্তি কিনতে আসা মোবারকপুরের আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, “ইফতারে বিশেষ এই জিলাপি আমি সবসময় রাখি। বিশেষ করে যেদিন ইফতারি দাওয়াত থাকে, সেই প্রোগ্রামে মাষকলাইয়ের আমিত্তি নিয়ে আসি। ছেলে-বুড়ো সবার পছন্দ ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’।” রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভান্ডারে আমিত্তি কিনতে আসা ফাহমিদা আক্তার তুলি বলেন, ‘মাষকলাইয়ের আমিত্তি’ আমার বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। আমার বৃদ্ধ শাশুড়িরও খুব পছন্দ। তাই প্রতিদিন ইফতারির জন্য মাষকলাইয়ের আমিত্তি নিয়ে যাই। শেরপুর গ্র্যাজুয়েট ক্লাবের সভাপতি আল আমিন রাজু বলেন, মাষকলাইয়ের আমিত্তির সঙ্গে এ অঞ্চলের দেড়শ বছরের ইতিহাস- ঐতিহ্য জড়িত। মাষকলাইয়ের আমিত্তিকে শেরপুরের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি চাই। এ বিষয়ে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. শাকিলুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, মাষকলাইয়ের আমিত্তির চাহিদা ও বিক্রির বিষয়ে শুনেছি। আমি পরিদর্শনেও গিয়েছি। কিন্তু এই আমিত্তি তৈরিতে যেন কোনো ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসআর/এএসএম