যে মন্দির ঘিরে এক শহর

সকালে বৌদ্ধনাথ স্তূপায় যখন ঢুকছিলাম, তখন সেখানে প্রার্থনা চলছে। প্রার্থনার দিন বলে মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে পুণ্যার্থীদের ভিড়, পর্যটক তো আছেই। স্তূপা অর্থ বৌদ্ধমন্দির। কাঠমান্ডুর থামেল থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে এ মন্দির। মন্দিরের চারপাশে রেস্টুরেন্ট, হোটেল, আর্ট স্কুল, আর্ট গ্যালারি, স্যুভেনির শপ আর নানান জিনিসের দোকান। মাঝখানে বৌদ্ধমন্দির। যেন এক মন্দির ঘিরেই এক শহর! নেপালের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এ স্তূপা নেপালের বৃহত্তম গোলাকার বৌদ্ধমন্দিরগুলোর একটি। কেবল নেপালেই নয়, এমন স্তূপা পৃথিবীতেই বিরল। সে কারণে ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এ মন্দির। এ ছাড়া মন্দিরটি কেবল নেপালিদের কাছেই নয়, সারা পৃথিবীর বৌদ্ধদের কাছে প্রার্থনার পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে এ মন্দির অন্যতম তীর্থস্থান। ফলে মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়েই দেখি বিভিন্ন দেশের পুণ্যার্থীদের পদচারণা। মন্দিরের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখি। স্যুভেনির শপ বা দোকানগুলোতে ঢুকে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করি। দেখতে পাই এখানকার ঐতিহ্যবাহী খুরকি (খাপওয়ালা এক ধরনের ছুরি), পুতির মালা, মুখোশ, কাঁসা-পিতলের মূর্তি, বিভিন্ন ধরনের অ্যানটিক, ট্যাপেস্ট্রি, নেপালের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনার ছবি সম্বলিত মগ, চাবির রিং, ক্যালেন্ডার, শুভেচ্ছা কার্ডসহ নানান ধরনের স্মারক। আর্ট গ্যালারিগুলোতেও ঘুরি। গ্যালারিগুলোতে বিক্রি হয় চিত্রকর্ম। সব দোকানেই পুণ্যার্থী ও পর্যটকের ভিড় আছে। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয় বসি চা খেতে। রেস্তোরাঁয়ও ভিড়! নেপালের ভাষায় এ মন্দির খাস্তি নামে পরিচিত। আর তিব্বতের ভাষায় পরিচিত জ্যারুং খাশোর নামে। মন্দির প্রাঙ্গণে মন্দিরের বর্ণনা সাঁটা। সমতল থেকে গোলাকার এ মন্দিরের চূড়া পর্যন্ত উচ্চতা ১১৮ ফুট। মন্দিরের প্রথম অংশে আছে ধাপে ধাপে তৈরি ৫টি গোলাকার ভিত্তি বা স্তর। এসব স্তর ইট-সুরকির তৈরি। এসব স্তরের ওপরে আছে গোলাকার গম্বুজ। এ গম্বুজ মহাবিশ্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এ গম্বুজও ইট-সুরকির তৈরি। এ গম্বুজের ওপর চারকোনা আকৃতির চূড়া। সোনালি রঙের এ চূড়া সোনায় মোড়ানো বিভিন্ন ধাতব দিয়ে তৈরি। চূড়ার প্রথম কিছু অংশ সমান। এ অংশটুকু আটটি রাস্তার প্রতীক। চূড়ার এ সমান অংশের চারপাশে দুটি করে চোখ ও একটি করে নাক আঁকা আছে। এ চোখ ও নাক জ্ঞান ও নির্বাণের প্রতীক। সমান অংশের পর থেকে পিরামিডের মতো ১৩টি ধাপে উঠে গেছে চূড়া। এ ধাপগুলো আলোকায়ন বা জ্ঞানদানের স্তরের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এর পরে আছে পদ্ম। পদ্ম সমবেদনা ও বিশুদ্ধতার প্রতীক। এর পরের অংশটি ছাতা হিসেবে বিবেচিত। এ ছাতা তিন রত্ন — বৌদ্ধ, ধর্ম ও সংঘকে রক্ষার প্রতীক। এ ছাড়া চূড়ার শেষ বিন্দু বা অংশটুকুকে সব পাহাড়ের রাজার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পুরো মন্দিরটি গড়ে উঠেছে ১০০ থেকে ১২০ মিটার ব্যাসের জায়গাজুড়ে। ইতিহাসের পাতায় এ মন্দির স্থাপনার কাহিনি নিয়ে রয়েছে নানা মত। নেপালের গোপাল রাজাবংশাবলীর (গপু) মতে, বৌদ্ধনাথ স্তূপা লিচ্চবি রাজ সিবাদেব (৫৯০-৬০৪ খ্রিস্টাব্দ) বা রাজা মানদেব (৪৬৪-৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) এটি নির্মাণ করেন। তবে তিব্বতিয়ানদের দাবী, খনন করতে গিয়ে ১৫শ শতাব্দির শেষ দিকে এখানে রাজা অংশুভার্মার (৬০৫-৬২১ খ্রিস্টাব্দ) হাড় খুঁজে পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রচলিত আছে, তিব্বতি রাজা ত্রিসং দেটসান (৭৫৫-৭৯৭ খ্রিস্টাব্দ) এ স্তূপা সংস্কার কাজে জড়িত ছিলেন। মন্দিরের চারপাশের দেয়ালের কিছু অংশ পরপর ড্রাম আকৃতির দৃষ্টিনন্দন প্রার্থনার চাকা আছে। কাঁসা-পিতল বা বিভিন্ন ধাতুর তৈরি এসব চাকায় খোদাই করে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন বাণী লিপিবদ্ধ করা আছে। কিছু চাকা ছোট, আবার কিছু চাকা বড়। পুণ্যের আশায় এসব চাকা ঘোরান মন্দিরে আসা পুণ্যার্থীরা। ছোট ছোট চাকার পাশাপাশি বিশাল একটি চাকা আছে মন্দিরে ওঠার ঠিক বিপরীতে একটি ঘরের ভেতর। দোতলা এ ঘরের নিচতলায় আছে এ চাকা। এ ঘরের সামনে বেশ বড় একটি পিতলের ঘণ্টা বাধা। এ ছাড়া মন্দিরের চারপাশে লম্বা লম্বা স্টিলের খুঁটিতেও প্রার্থনার চাকা লাগানো। মন্দিরের একেবারে চূড়া থেকে নিচ পর্যন্ত ঝোলানো আছে লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ও সাদা রঙের কাপড়ের ছোট ছোট পতাকা। মূলত এ পতাকাও ঝোলানো হয়েছে পুণ্যের আশায়। মন্দির প্রাঙ্গণে অসংখ্য কবুতর উড়ছিল। সেগুলোকে চাল বা গম জাতীয় খাবার খেতে দিচ্ছিলেন পর্যটক ও পুণ্যার্থীরা। সেখানেই চাল ও গমের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালের অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সঙ্গে এ মন্দিরের চূড়াটিও ভেঙ্গে যায়। পরে চীনের সহযোগিতায় এটি আবার সংস্কার করা হয়। এখন যেটি দেখা যাচ্ছে সেটি সংস্কারের পরের রূপ। আমরা মন্দিরের চারপাশে অনেকক্ষণ ঘুরি। সত্যিই মনে হয়, যেন এ মন্দিরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পুরো একটি শহর। আর এ শহরে পৃথিবীর নানান দেশ থেকে আসা পর্যটকের অভাব নেই। সময় থাকলে পুরো দিনই থেকে যাওয়া যায় এখানে। কিন্তু আমাদের হাতে সেই সময় নেই। যেতে হবে অন্য আরও অনেক জায়গায়। মন্দিরে ঢোকার গেট অনেকগুলো। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসেবে পঞ্চাশ রুপির টিকিট কেটে আমরা যে গেট দিয়ে ঢুকেছি, আবার সেই গেট দিয়েই বের হই। রিজার্ভ করা টাক্সিচালক আমাদের নিয়ে রওনা হন দর্শনীয় আরেক স্থানে। ছবি : লেখকআরএমডি