ইরান যুদ্ধ ‘শেষ করে আনার’ কথা বিবেচনা করছেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরান যুদ্ধ ‘শেষ করার’ বিষয়টি বিবেচনা করছেন। আর এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব সেই দেশগুলোর হওয়া উচিত, যারা এটি ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের মধ্যে নয়। গত মাসে সংঘাত শুরুর পর ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানির দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা দাবি করেছেন, তাদের দেশ শত্রুকে ‘চমকে দেওয়ার মতো আঘাত’ করেছে। এর আগে ট্রাম্প একাধিকবার যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে বলে ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই সপ্তাহেই হোয়াইট হাউজ যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ চেয়েছে। একই সঙ্গে আরও সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়, ফ্লোরিডায় রওনা হওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে ট্রাম্প বলেন, আমি যুদ্ধবিরতি চাই না। আপনি যখন প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছেন, তখন যুদ্ধবিরতি করা যায় না। তবে পাম বিচের উদ্দেশে যাত্রার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সন্ত্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের বড় সামরিক অভিযান কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করছি। হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এটি প্রয়োজন অনুযায়ী পাহারা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—যেসব দেশ এটি ব্যবহার করে তাদেরই। যুক্তরাষ্ট্র নয়। এর আগে একই দিনে তিনি ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেন, কারণ তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে রাজি হয়নি। তিনি দাবি করেন, এটি একটি ‘সহজ’ সামরিক পদক্ষেপ। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, তাদের জন্য এটা খুব সহজ, ঝুঁকিও কম। কাপুরুষ, আমরা এটা মনে রাখবো! এটি প্রথম নয় যে ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। ৯ মার্চ তিনি সিবিএসকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, আমার মনে হয় যুদ্ধ প্রায় শেষ। সেদিন ফ্লোরিডায় জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ ‘খুব দ্রুতই’ শেষ হবে। তবে শুক্রবার (২০ মার্চ) বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, পেন্টাগন কর্মকর্তারা ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর জন্য বিস্তারিত প্রস্তুতি নিয়েছেন। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ইরানে প্রবেশ করেন, তাহলে আটক ইরানি সেনাদের কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা ও যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আরেকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের উপকূলবর্তী খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে প্রশাসন। এরই মধ্যে চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপে বোমা হামলা চালিয়েছে, যেখানে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল রয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যে কোনো সময় খার্গ দ্বীপ ধ্বংস করতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান বিবিসিকে বলেন, অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে এক সপ্তাহ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সহায়তা আসবে, তবে সব বাহিনী পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। এদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ট্যাংকারে আটকে থাকা ১৪ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির সুযোগ দিতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিনের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট করে তুলছে, যা নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এদিকে, ইরান সৌদি আরব ও ইসরায়েলের দিকে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পারস্য নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে শুক্রবার দেওয়া এক লিখিত বার্তায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, ইরান শত্রুকে ‘চমকে দেওয়ার মতো আঘাত’ করেছে। তিনি বলেন, এখন শত্রু পরস্পরবিরোধী ও অর্থহীন কথা বলছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আপনাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তার ফলে শত্রু পরাজিত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সূত্র: আল-জাজিরা এসএএইচ