‘ছোটবেলায় ঈদ গিফট হিসেবে আমার প্রথম পছন্দ ছিল ব্যাট-বল’: তানজিদ তামিম

‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’ আর লক্ষ্য যদি থাকে অটুট, তবে দেখা মেলে সাফল্যের। সময়ের সবচেয়ে ইনফর্ম ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের ক্ষেত্রে এই প্রবচন একদম সত্য। সেই ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেট তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। যে বয়সে বাচ্চা ছেলেরা জামাকাপড় আর জুতো কেনার বায়নায় বাবা-মাকে পাগল করে ফেলে, যে বয়সী ছেলেরা ঈদের সেলামি পেতে উন্মুখ হয়ে থাকে; বগুড়ার ২৫ বছরের তরুণ বাঁহাতি ওপেনার তানজিদ তামিম সেই স্কুলের নিচের ক্লাসে পড়া অবস্থায় জামাকাপড় আর সেলামি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বাবা-মায়ের কাছে ব্যাট-বলের জন্য জেদ ধরতেন। \"আমার অন্য কিছু না হলেও চলবে, তবে ব্যাট আর বল চাই-ই চাই\"—এই ছিল ক্লাস টুতে পড়া শিশু তানজিদ তামিমের চাওয়া। সবাই চায় পরিবার, পরিজন, আপনজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সাথে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে। তাই তো ঈদ আসলেই সবাই ছুটে যান শেকড়ের টানে, আপন মানুষের কাছে। আর সে কারণেই প্রতিবছর দুই ঈদকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে গাড়ি, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা দেখা দেয়। তবে ফুটবলার বা ক্রিকেটারদের অনেকের এখন আর আগের মতো পরিবারের সাথে ঈদ করার সুযোগ হয় না। যেহেতু ক্রিকেট এখন সারা বছর ধরেই খেলা হয় এবং ঘরোয়া আসর ছাড়াও মহাদেশীয়, আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক আসর নিয়মিত আয়োজিত হয়, তাই ক্রিকেটারদের অনেক ঈদই দেশের বাইরে কাটাতে হয়। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ছাড়াও আইসিসির এফটিপি সিরিজের ব্যস্ততা তো আছেই। এবারের ঈদের ছুটিতে জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য থাকছে ক্রিকেটারদের ছেলেবেলার ঈদ ও স্মৃতিময় সব ঘটনা। আজ দ্বিতীয় পর্বে নিজের শৈশবের গল্প শুনিয়েছেন সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটার তানজিদ হাসান তামিম। জাগো নিউজের সাথে ছেলেবেলার ঈদ আর এখনকার প্রেক্ষাপটে ঈদ নিয়ে একান্তে কথা বলতে গিয়ে তানজিদ তামিমের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে মায়ের কাছে ব্যাট ও বল কেনার আবদারের কথা। কেমন ছিল তাঁর ছেলেবেলার ঈদ? তিনি কি ভালো ভালো সুন্দর জামাকাপড় আর সেলামি পেতেই মুখিয়ে থাকতেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তানজিদ তামিম শোনালেন এক চমৎকার গল্প, যার পরতে পরতে ছিল ক্রিকেটার হওয়ার সুপ্ত বাসনা। তাঁর জন্ম বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার ফোরপুর গ্রামে। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর পরই বগুড়া জেলা স্কুলে ভর্তির অ্যাডমিশন কোচিং করতে তাঁর বগুড়া শহরে চলে আসা। সেখানেই এক পাড়ার বড় ভাইকে দেখে ক্রিকেটে উৎসাহ জাগে। মনে হয়—‘আমিও ক্রিকেটার হব, ভালো ব্যাটসম্যান হব, বড় হব, অনেক নাম করব।’ সুযোগও চলে আসে। তামিম বলেন, \'আমি যখন ক্লাস টুতে জেলা স্কুলে অ্যাডমিশন দেই, তখন বগুড়া শহরে আসি নতুন নতুন। তখন একটা ভাড়া বাসায় উঠেছিলাম। আমরা যে বাসায় থাকতাম, ঐ বাসার সামনে একটা ছোট্ট মাঠ ছিল। সেই মাঠে দেখতাম একজন বড় ভাই প্রতিদিন এসে প্র্যাকটিস করতেন। একটা ডাব গাছ ছিল মাঠের একদম লাগোয়া। সেই ডাব গাছে বল ঝুলিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। সেটা দেখে আমার আগ্রহ বেশি জন্মে। আমারও মনে ক্রিকেট খেলার ইচ্ছে প্রবল হয়, ক্রিকেটার হবার বাসনাও তীব্র হয়। সে সময় জেলা স্কুলে অ্যাডমিশনের চাপ একটু বেশিই ছিল, পড়ার চাপ অনেক ছিল। কিন্তু আমি সেই পড়া ফাঁকি দিয়েও ঐ ভাইয়ার কাছে গিয়ে প্র্যাকটিস দেখতাম। ভাইয়া আমাকে অনেক কিছু বলেওছেন, ক্রিকেটের বেসিক বিষয়গুলো আমাকে ধরিয়ে দিতেন, দেখিয়ে দিতেন। সেই ভাইটার নাম সজল। ওখান থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে।\' ছোটবেলার ঈদ স্মৃতির কথা উঠলেই তামিমের চোখে দাদুর বাড়ির স্মৃতি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, \'আমরা দাদুর বাড়িতেই ঈদ করতাম প্রতিবার। ওখানে আমার সারাদিন ক্রিকেট খেলেই কাটত। সকালে ক্রিকেট, দুপুরে ক্রিকেট এবং বিকেলে ক্রিকেট। এমনকি ঈদের দিনও নামাজ পড়েই বন্ধুবান্ধব আর কাজিনদের সাথে নিয়ে মাঠে যেতাম। আমার দাদুর বাড়ির কাছেই ছিল বিশাল স্কুল মাঠ। সেটাই আমার সবচেয়ে স্মৃতিময় মাঠ। সেখানে আমার খেলা হয়েছে বেশি। গ্রামে থাকে না—এক গ্রাম আর আরেক গ্রামের খেলা; আমরা সেই ম্যাচগুলো খুব বেশি খেলতাম। অন্য গ্রামের সাথে ম্যাচ। ঈদের আগে আগেই বলে-কয়ে রাখতাম এবার ঐ গ্রামের সাথে খেলা হবে। তাই হতো। খুব মজায় আমরা ঈদের ছুটির দিন কটা কাটাতাম।\' এই বাঁহাতি ওপেনারের ছোটবেলার আবদার নিয়ে বলেন, \'আসলে ঈদ গিফট হিসেবে পছন্দের জিনিস বলতে আমার চাওয়াই ছিল ব্যাট-বল। ঈদে সব ছেলেমেয়েই জামাকাপড় চায় বাবা-মায়ের কাছে, আর আমি চাইতাম ব্যাট-বল। রীতিমতো জেদ ধরতাম। সবসময় আম্মুর কাছে বায়না ধরতাম—আমাকে ব্যাট ও বল কিনে দাও। আমি মার্কেটে যেতাম না, আম্মুই মার্কেটিং করে আনতেন। ওখানকার একটা মার্কেট থেকে আমার জন্য টেনিস বল আর সেই বল দিয়ে খেলার মতোই ব্যাট কিনে দিতেন। স্কুল জীবনে এগুলোই আমার স্মৃতি।\' বর্তমানে দেশের বাইরে ঈদ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তামিম বলেন, \'গ্রামে সবসময় আব্বু-আম্মুর সাথে ঈদ করা হয়। এখন যখন মাঝে মধ্যে ঈদের মধ্যেও দেশের বাইরে খেলতে যেতে হয়, ঐ সময়টা মিস করি। বারবার মনে হয় সবার কথা। বাবা-মায়ের পাশাপাশি কাজিনরাও সবাই আসে, তাদের কথাও খুব মনে পড়ে। সবার সাথে মজা করা, গেট টুগেদার হতো। আমরা কাজিনরা মিলে সবাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। যখন দেশের বাইরে ঈদ করি, সেগুলোর কথা খুব মনে হয়।\' পরিবার ছাড়া প্রথম দেশের বাইরে ঈদ করার স্মৃতি মনে করে তিনি জানান, \'সেটা সম্ভবত ২০১৯ সালে। আমরা ইংল্যান্ডে ত্রিদেশীয় অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। সেবার আমার বাড়িতে ঈদ করা হয়নি। বাংলাদেশ, ভারত ও ইংল্যান্ড—তিন জাতির আসর ছিল ওটা। তখন ছিল কোরবানির ঈদ। তখন একটু খারাপ তো লেগেছিলই। তবে আমাদের টিম বন্ডিং এত বেশি ছিল, আমাদের সম্প্রীতি, সংহতি, একতা ও ঐক্য ছিল প্রচুর। সবাই রিলেটিভের মতোই হয়ে পড়েছিল। সবাই আমরা একটা পরিবারের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। ততটা খারাপ লাগেনি। সবাই একসাথে নামাজ পড়েছি, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করেছি, সবাই ঘুরতেও বেরিয়েছি। খুব এনজয় করেছি। তারপরও দিনশেষে ফ্যামিলিকে তো সবাই মিস করে, আমিও করেছি।\' ন্যাশনাল টিমের হয়ে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজে কোরবানির ঈদ করেছেন তামিম। তবে এবারের ঈদুল ফিতরে তিনি ফিরে এসেছেন নিজের শিকড়ে। তিনি বলেন, \'পরিবারের সাথে ঈদ করতেই অনেক বেশি ভালো লাগে, তাই বগুড়া চলে এসেছি। সবাই মিলে ঈদের খুশি আর আনন্দ শেয়ার করতে। সবাইকে ঈদ মোবারক।\' এআরবি/এসকেডি/এএসএম