১৮৬৭ সালে পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় পাবনা পৌরসভা। এরপর ১৯৮৯ সালে একে প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নেই সেই সেবার মান। পরিচ্ছন্ন ও প্রশস্ত সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশনে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা- এসবের কিছুই নেই জেলা শহরের প্রাচীন এ পৌরসভাটিতে। এমনকি রাতে অধিকাংশ সড়ক ডুবে থাকে অন্ধকারে আর দিনে যানজটে নাকাল থাকে জনজীবন। সূত্র বলছে, ১৮২৮ সালে পাবনা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর এই শতকের মাঝামাঝিতে একটি শহর কমিটি গড়ে তোলার মাধ্যমে সবশেষ ১৮৬৭ সালের ১ এপ্রিল প্রথম জেলা শহর পৌরসভা হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। তবে তখনও প্রত্যক্ষ ভোটে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের প্রচলন শুরু হয়নি। জেলা প্রশাসক মনোনীত প্রশাসককে কার্যক্রম চলার পর কয়েকবার চেয়ারম্যান নির্বাচন দেওয়া হয়। সবশেষ ১৯৮৯ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বিশু চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর পৌরসভাটিকে ‘ক’ অথবা প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এসময় পৌর এলাকার কিছুটা উন্নয়ন হয়। এরপর কয়েক মেয়াদে মেয়র থাকা কামরুল হাসান মিন্টুর সময় কিছু সড়ক নির্মাণসহ কিছুটা উন্নয়নের ছোঁয়া পায়। এর বাইরে তেমন দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যায়নি পৌরসভাটিতে। নগর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম শ্রেণির হলেও পৌরসভার নেই কোনো মাস্টারপ্ল্যান। সাধারণ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না সেটি সম্পর্কেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। ২৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট এই পৌর এলাকায় ৩ লাখ লোকের বসবাস। এমন ঘনবসতির শহরে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র গড়ে উঠছে হাইরাইজ বিল্ডিং। মহল্লার সরু গলির মাথা বা মোড়ে মোড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে আবাসিক বিল্ডিং ও বিপণিবিতান। অগ্নিকাণ্ড বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এগুলোতে ফায়ার সার্ভিস বা সংশ্লিষ্ট রেসকিউ টিম প্রবেশের পর্যাপ্ত সুযোগও নেই। শহরের প্রত্যেকটি সড়ক এতটাই সরু যে অনেক গলিতে অ্যাম্বুলেন্সও প্রবেশ করতে পারে না। শহরের প্রধান সড়কের অবস্থাও নাজুক, বিবেচনা ছাড়া অটোরিকশার অনুমোদন ও অবাধ চলাচলে যানজটে অতিষ্ঠ জনজীবন। নেই ভালো ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের গাছপাড়া, নুরপুর ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের মতো প্রধান সড়ক ও কেন্দ্রগুলোতে অব্যবস্থাপনায় ফেলা হয় বর্জ্য। একটু বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় শহরের অধিকাংশ মহল্লার সড়ক। ভারি বৃষ্টিতে পানি উঠে আসে প্রধান সড়কগুলোতেও। ফলে দুর্ভোগ ও অনিরাপত্তায় বসবাস করছেন পৌরবাসী। শহরের ছোট শালগাড়িয়া এলাকার সদরুদ্দিন বলেন, ‘এরকম প্রাচীন একটি জেলা শহরের পৌরসভা এটি। কী সেবা দিচ্ছে আমাদের? শহর থেকে আতাইকুলা এই সড়কে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই পানি জমে। আর তেমন বৃষ্টি হলেতো কোমর অবধি পানি জমে। অটোবাইকও চলতে পারে না। বাসা বাড়িতেও পানি ওঠে। শুরু থেকেই এই সমস্যা হলেও এর সমাধান এ যাবৎ দেখলাম না।’ রিকশাচালক হামিদ ও আসলাম বলেন, অলি গলি বাদ দিলাম, শহরের মেইন আব্দুল হামিদ রোডও চওড়া না হওয়ায় রিকশা নিয়ে জ্যামে আটকে থাকতে হয়। রাতে মেইন রোড বাদে রিকশা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। অন্য রোডগুলোতে বাতি নাই। আবার থাকলেও সেগুলো জ্বলে না। এগুলো কেউ দেখেও না। আটুয়া এলাকার রাইসুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য অপসারণে ভালো ব্যবস্থা নেই। বাড়ি বাড়ি এসে পৌরসভা থেকে কিছু লোক ময়লা নিয়ে যায়। কিন্তু এতে তাদের ১৫০-২০০ টাকা দিতে হয়। আবার পানি সরবরাহে এখনো সেই সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে সুপেয় পানি তেমনভাবে মেলে না। ফলে বাধ্য হয়ে নগরবাসীর অধিকাংশই উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে নিয়েছে। এতো পুরোনো একটি পৌরসভায় আজও কোনো শৃঙ্খলা ফিরলো না। পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, জনপ্রতিনিধি এসেছে আবার গেছে। কিন্তু পৌরবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। পাবনার তুলনায় পার্শ্ববর্তী অনেক কমবয়সী জেলাগুলোর পৌরসভার জীবনমান অনেক এগিয়ে। অথচ পাবনা সেই মান্ধাত্য আমলের হযবরল পরিস্থিতিতে রয়েছে। তবে এবার একটা পরিবর্তন প্রয়োজন। মার্কেট, আবাসিক ভবন, টার্মিনাল - এসবকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা উচিত। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কোনোভাবেই আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও শৃঙ্খল নগরী তোলা সম্ভব নয় জানিয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আশরাফুজ্জামান প্রামাণিক বলেন, এই প্ল্যানের আওতায় জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিল্ডিং কোড মেনে স্থাপনা গড়তে হবে। শহরের একটা জায়গায় গাদাগাদি করে মার্কেট, আবাসিক এলাকা ও টার্মিনাল রয়েছে। এটি কোনো সুশৃঙ্খল নগরীর চিত্র নয়। মূল শহর থেকে দূরে আলাদা আলাদা জোন করে আবাসিক এলাকা, মার্কেট ও টার্মিনাল স্থাপন করতে হবে। সড়কগুলো প্রশস্ত ও আধুনিক করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নজর দিতে হবে। পাশাপাশি পৌর কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারি বরাদ্দের বাইরেও আন্তর্জাতিকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও কনসাল্টিং টিমের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে পাবনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দুলাল হোসেন বলেন, পকেটে টাকা না থাকলে পরিকল্পনা কঠিন বিষয় হয়। এতো পুরোনো একটি পৌরসভা হলেও এটির দিকে কোনো জনপ্রতিনিধি বা এরকম কেউ তেমনভাবে নজরই দেননি বলা যায়। ফলে পৌর অঞ্চলের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সবকিছু সেই মান্ধাত্য আমলের জরাজীর্ণতায় ডুবে আছে। এ থেকে বের হতে পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমাদের বাজেট হয় রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে। প্রায় ২০ কোটি টাকার মতো আমাদের রাজস্ব আদায় হয়। প্রতিবছর ১২ কোটি টাকার মতো কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতা বাবদই ব্যয় হয়। অন্যান্য মেইনটেনেন্স ব্যয়তো আছেই। বাকি থাকে অল্পকিছু টাকা। সরকার বা বাইরের কোনো বরাদ্দও তেমনভাবে আসে না। তাহলে কীভাবে এই জরাজীর্ণতা কাটবে? পৌরসভাকে আধুনিক করতে পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন। এটি পেলে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় একটি সুপরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এফএ/এএসএম