কবিরুল বাসার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ। তিনি ২৬ বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি ঢাকা শহরে মশার উপদ্রব ব্যাপক বেড়েছে। কোনোভাবেই এ মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন কবিরুল বাসার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মুসা আহমেদ। জাগো নিউজ: মশা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। সবশেষ গবেষণায় কী পেলেন? কবিরুল বাসার: সবশেষ জরিপে আমার দল দুই ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে—মশার লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি গণনা করে। লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ। প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও চমকে দেওয়ার মতো। একজন মানুষের পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০, যা আশঙ্কাজনক। মার্চে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি। এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত। জাগো নিউজ: শীত বা শুষ্ক মৌসুমে মশার উপদ্রব বাড়ার কারণ কী? কবিরুল বাসার: রাজধানীতে মশার প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ড্রেন ও নর্দমার পানি জমে থাকে। ফলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার দ্রুত বাড়ে। শীতের পর তাপমাত্রা বাড়াও মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ সময় মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের তদারকি কমে যায়। এ কারণে এবার মশা বেশি। আরও পড়ুন মশা কি আদৌ কোনো কাজে আসেশুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না: ডিএনসিসি প্রশাসকমশা কেন কানের কাছে এসেই গুনগুন করে?যে দেশে কোনো মশা নেই জাগো নিউজ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও মেয়ররা সরাসরি মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ দেখভাল করতেন। এখন তাদের অনুপস্থিতি কোনো প্রভাব ফেলেছে? কবিরুল বাসার: প্রায় দেড় বছর নগরে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মেয়র নেই। ফলে মাঠ পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকিতে প্রভাব পড়েছে। সামগ্রিকভাবে কাউন্সিলরদের সক্রিয়তার ঘাটতির ফলে চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মশককর্মীদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। জাগো নিউজ: রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক ডোবা-নালা ও পরিত্যক্ত জায়গা রয়েছে। যেখানে মশার লার্ভা জন্মাচ্ছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান জনবল কাঠামো তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন? কবিরুল বাসার: এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে। তবে অনেকের মতে জনবল আরও বাড়ানো প্রয়োজন। জাগো নিউজ: সিটি করপোরেশন কী উদ্যোগ নিলে নগরে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে মনে করেন? কবিরুল বাসার: এ অবস্থায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বেসরকারি খাতে দেওয়ার প্রস্তাব উঠে এসেছে। মশক নিধন প্রাইভেট ব্যবস্থাপনায় দিলে জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে কাজের মান উন্নত হতে পারে। কাউকে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে, যাতে ভবিষ্যতেও তারা কাজ পাওয়ার সুযোগ পায়। এমএমএ/এএসএ