ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে

ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ শেষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন যা তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়ছে, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধটি কেবল একটি ‘স্বল্পকালীন অভিযান’ হবে বলে তার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।কোণঠাসা ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী সুরক্ষিত করতে সাহায্য চেয়ে না পেয়ে ন্যাটো দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তারপরও তিনি দাবি করেছেন যে, এই অভিযান ‘পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে’। কিন্তু গত শুক্রবার (২০ মার্চ) যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামরিকভাবে জয় হয়েছে’ বলে তার দাবি হার না মানা ইরানের বাস্তবতার সাথে একগুয়ে ও সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে। যেখানে আক্রান্ত হয়েও দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং একই সাথে অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ট্রাম্প, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য দেশে ‘নির্বোধ’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই তিনিই এখন এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, যার ফলাফল বা স্পষ্ট কোনো বার্তা—কোনোটাই এখন আর তার হাতে নেই। যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব তার শাসনকাল এবং তার দলের রাজনৈতিক সম্ভাবনা উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যখন রিপাবলিকানরা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আরও পড়ুন: ইরানের তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নামক একটি ফাঁদে নিজেই পা দিয়েছেন এবং তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে তা থেকে বের হবেন। এটাই তার হতাশার সবচেয়ে বড় কারণ।’ হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বিশ্লেষকদের এই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধে বড় ধরনের ‘সাফল্য’ অর্জন করেছে। তার দাবি, ইরানের অনেক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, দেশটির নৌবাহিনীর বেশিরভাগ অংশ ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার বহুলাংশে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা একটা অনস্বীকার্য সামরিক সাফল্য।’ ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কূটনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা গত সপ্তাহে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের আরেকজন কর্মকর্তার মতে, হরমুজ প্রণালী সুরক্ষিত করতে সাহায্য করার জন্য ন্যাটোর সদস্য এবং অন্যান্য বিদেশী সহযোগীদের নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রতিরোধের কারণে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন। এই প্রতিবেদনের জন্য রয়টার্সের সাথে কথা বলা অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতো তিনিও অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। আলোচনার সাথে জড়িত একজন ব্যক্তি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নিজেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখাতে না চাওয়ায় হোয়াইট হাউসের কিছু সহযোগী ট্রাম্পকে দ্রুত একটি ‘প্রস্থান পথ’ খুঁজে বের করতে এবং সামরিক অভিযানের পরিধি সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই যুক্তি ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল কিনা তা স্পষ্ট ছিল না। কিছু বিশ্লেষকের মতে, মিত্র দেশগুলোর অনাগ্রহ শুধু এই কারণে নয় যে তারা এমন এক যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যেটি নিয়ে তাদের সঙ্গে আগে পরামর্শ করা হয়নি—বরং ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর গত ১৪ মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে খাটো করে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধেও এটি এক ধরনের প্রতিক্রিয়া। আরও পড়ুন: ন্যাটো মিত্রদের ‘কাপুরুষ’ বললেন ট্রাম্প! ইসরাইলের সঙ্গে মতপার্থক্যও সামনে আসতে শুরু করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের হামলার বিষয়ে তিনি আগে কিছুই জানতেন না। কিন্তু ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইস্যুতে ট্রাম্প এখন একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছেন, আর তিনি কোন পথে এগোবেন—তা এখনও পরিষ্কার নয়। তিনি চাইলে পুরো শক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও জোরদার করতে পারেন—এমনকি ইরানের খার্গ দ্বীপের তেলকেন্দ্র দখল করা বা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার খুঁজতে উপকূল এলাকায় সেনা মোতায়েন করাও হতে পারে। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়িত থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা বেশিরভাগ আমেরিকানই সমর্থন করবে না। অন্যদিকে এখন যেহেতু দুই পক্ষই আলোচনায় যেতে রাজি নয়, ট্রাম্প চাইলে ‘বিজয়’ ঘোষণা করে সরে আসতেও পারেন। কিন্তু এতে উপসাগরীয় মিত্ররা ক্ষুব্ধ হতে পারে, কারণ তারা তখন একটি ক্ষতবিক্ষত ও শত্রুভাবাপন্ন ইরানের মুখোমুখি থাকবে—যে দেশটি এখনও সাধারণ মানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাতে পারে এবং উপসাগরের নৌপথে প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। আরও পড়ুন: ইরানের ওপর আজ ‘সবচেয়ে বড় হামলা প্যাকেজ’ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র: পিট হেগসেথ রয়টার্স শুক্রবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত হাজার হাজার মেরিন ও নৌসেনা মোতায়েন করছে, যদিও সরাসরি ইরানে সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের ওপর তার আগের মতো শক্ত নিয়ন্ত্রণও দুর্বল করছে। কিছু প্রভাবশালী সমর্থক ইতিমধ্যেই এই সংঘাতের বিরোধিতা শুরু করেছেন। যদিও তার সমর্থকদের বেশিরভাগ এখনও তার পাশে আছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন হয়, তাহলে আগামী সপ্তাহগুলোতে তার প্রভাব কমে যেতে পারে। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন বলেন, ‘যখন অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে, তখন মানুষ প্রশ্ন তুলবে—‘আমি আবার কেন বেশি দামে জ্বালানি কিনব?… কেন হরমুজ প্রণালী এখন ঠিক করে দিচ্ছে যে, আমি আগামী মাসে ছুটি কাটাতে পারব কি না?’। ভুল হিসাব-নিকাশ হোয়াইট হাউসের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর প্রশাসনের ভেতরে ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, এই সংঘাত ও এর সম্ভাব্য পরিণতি আগে আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল।  তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, পুরো অভিযানটি ভালোভাবেই পরিকল্পিত ছিল এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল—ইরান এই যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা ঠিকভাবে না বোঝা। তেহরান তাদের বাকি ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে, যাতে প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তির ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়া যায়। তারা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা করেছে এবং হরমুজ প্রণালী—যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়—প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। আরও পড়ুন: তেলের ওপর মার্কিন বিধিনিষেধ নিয়ে সুখবর পেল ইরান ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা এসব ঝুঁকি আগে থেকে বুঝেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়; তবে তারা এগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জন বাস বলেন, ‘তারা সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো নিয়ে যথেষ্ট ভাবেননি—যেখানে যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী না-ও এগোতে পারে।’ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের হতাশার লক্ষণও বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনে তিনি সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন এবং যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে—এমন অভিযোগে ভিত্তিহীনভাবে ‘দেশদ্রোহিতা’র কথা বলেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘তিনি আগের মতো সংবাদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, কারণ এখনো তিনি ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না কেন তিনি দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এবং সামনে কী হবে। বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি আগের সেই দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছেন।’