পরিবারের সান্নিধ্য নেই, নেই বাবা-মায়ের আঁচল; তবুও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়নি লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের ৮০ জন নিবাসী। নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর সুস্বাদু খাবারের আয়োজনে অনাথ এই শিশুদের ঈদ কেটেছে উৎসবমুখর পরিবেশে। একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, স্নেহ আর মমতায় ঘেরা এই প্রতিষ্ঠানটিই এখন তাদের বৃহত্তর পরিবার। শনিবার (২১ মার্চ) ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গেই শিশু পরিবার প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে শিশুদের উচ্ছল হাসিতে। দিনটি শুরু হয় পরোটা, ডিম, ডাল ও সেমাইয়ের তৃপ্তিদায়ক নাস্তা দিয়ে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশিত হয় মিষ্টি ফিন্নি। তবে দুপুরের আয়োজনে ছিল আসল চমক—খাসির পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট ও দই-মিষ্টির রাজকীয় মেন্যু। উন্নতমানের এই খাবার শিশুদের ঈদের আনন্দকে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। এর আগে সকালে শিশু পরিবার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নিজেদের পরিবেশিত গান, আবৃত্তি আর নৃত্যের ছন্দে পুরো পরিবেশকে মোহনীয় করে তোলে শিশুরা। দীর্ঘদিন এই শিশু পরিবারের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা জেমি আক্তার বলেন, একদিন ছোট্ট শিশু হয়ে এই আঙিনায় এসেছিলাম। দীর্ঘ সময় পার করে এখন অনেকটাই বড় হয়েছি। আমরা এখানে প্রায় আশি জনের মতো আছি। সবাই মিলে হাতে মেহেদি দেওয়া, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, সাজগোজ করা, এই মুহূর্তগুলো সত্যিই অন্যরকম। নিজের বাসায় থাকলে হয়ত নানার বা দাদার বাসায় যাওয়া হতো, কিন্তু এতগুলো মানুষের সঙ্গে এমন বাঁধভাঙা আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ হয়ত পেতাম না। আরেক নিবাসী টুম্পা ব্যানার্জির কণ্ঠেও ছিল একই সুর। পরিবার ছাড়া ঈদের দিনটি শুরুতে কিছুটা মন খারাপের হলেও এখানকার উষ্ণ পরিবেশ তাকে ভরিয়ে দিয়েছে। তার কথায়, এখানে খালাম্মারা আমাদের মায়ের অভাব বুঝতে দেন না, আর স্যারেরা যেন ঠিক বাবার মতোই। নিজের বাসায় থাকলে হয়ত এমন দামি খাবার জুটতো না, যা আমরা এখানে পাচ্ছি। সবাই মিলে একসঙ্গে ঈদ করার এই আনন্দটাই অন্যরকম। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সিনথিয়া আক্তারের জীবনের ১৩টি বছর কেটেছে এখানেই। সে জানায়, আমরা সারা বছর এই দিনটির অপেক্ষায় থাকি। এখানকার আপারা আমাদের অনেক স্নেহ আর মমতা দিয়ে আগলে রাখেন। আজকে আমরা নাচ-গান করেছি, মেহেদি দিয়েছি। ডিসি স্যার, এসপি স্যার এসেছেন,সব মিলিয়ে আমাদের ঈদ খুব দারুণ কেটেছে। দুপুরে শিশুদের এই অনাবিল আনন্দে শরিক হতে ছুটে আসেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার এবং পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান। তারা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, গল্প করেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, খুশি কখনো একা উদ্যাপন করা যায় না, সবাইকে নিয়ে করতে হয়। এখানকার এতগুলো বাচ্চাকে আমার নিজের পরিবারের সন্তানই মনে হচ্ছে। তাদের সঙ্গে ঈদের এই নির্মল আনন্দ ভাগাভাগি করতেই মূলত ছুটে আসা। জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, অনাথ এই শিশুদের জন্য সরকার এবার চমৎকার খাবারের আয়োজন করেছে। এই শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারা এবং তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে পারাটা আমাদের জন্যও পরম তৃপ্তির ও শুকরিয়ার। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ফজলুল হক সকাল থেকেই উপস্থিত থেকে সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন। তিনি জানান, সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে সারা দিনের খাবারের মেন্যু এবার খুবই উন্নতমানের। শিশুদের নতুন পোশাক দেওয়া হয়েছে। দুপুরের খাবারের পর সন্ধ্যায় তাদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে তাদের খুশির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। মহসীন ইসলাম শাওন/কেএইচকে/এমএস