জামালপুরে সাঁকো ভেঙে মৃত ৫ শিশুর দাফন সম্পন্ন

ঈদের আনন্দে মেতে উঠতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসমান সেতু পার হয়ে একটি পার্কে যাচ্ছিল পাঁচ শিশু। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অতিরিক্ত চাপে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ড্রামের তৈরি ভাসমান সাঁকোটি ভেঙে যায়। নদের পানিতে ডুবে অকালেই ঝরে গেল পাঁচটি তাজা প্রাণ।রোববার (২২ মার্চ) সকালে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে চোখের জলে নিহত এই পাঁচ শিশুর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা  শনিবার (২১ মার্চ) বিকেল ৪টার দিকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের মডেল থানার সামনে কালিকাপুর ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত প্লাস্টিক ড্রামের ভাসমান সাঁকো ভেঙে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুরা হলো: দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ি ইউনিয়নের ডাকাতিয়াপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীনের মেয়ে মায়া মনি (১০) ও ছেলে মিহাত (১৪), একই উপজেলার বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ঝালুরচর এলাকার শের আলীর ছেলে আব্দুল মোতালেব (৬) ও মেয়ে খাদিজা (১২) এবং দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের বেলতলি বাজার এলাকার হাবিবুল্লাহর ছেলে আবির হোসেন (১৪)। স্থানীয়রা জানান, নদের পূর্ব তীরে চর কালিকাপুর এলাকায় মালিহা পার্ক নামে একটি বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্যবসার কথা ভেবে পরিত্যক্ত সাঁকোর সামনে একটি বিলবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। সেই পার্কে যাওয়ার জন্যই বিকেল থেকে নদের পশ্চিম তীরে ভিড় জমান নানা বয়সী মানুষ। অতিরিক্ত লোকের চাপে বিকেল ৪টার দিকে পরিত্যক্ত সাঁকোটি ভেঙে প্রায় শতাধিক মানুষ নদের পানিতে পড়ে যান। এতে পাঁচ শিশু নিহত এবং শান্তি নামে এক শিশু আহত হয়। তাকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আরও পড়ুন: ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে ৫ শিশুর মৃত্যু, ঈদের আনন্দে পরিবারে বিষাদে ছায়া স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনের ভূমিকা  স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতা ও পার্ক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারা জানান, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাঁকোটির আর কোনো সংস্কার হয়নি এবং এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সেটি বন্ধ থাকলেও, পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্যবসার আশায় সেখানে বিলবোর্ড টাঙায়। সাঁকো দিয়ে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে কোনো লোক নিয়োগ না করায় অতিরিক্ত চাপে এই বিপর্যয় ঘটে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিহা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘থানার সামনে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে, তাই প্রচারণার জন্য বিলবোর্ড লাগানো হয়েছিল। সাঁকোটি পরিত্যক্ত বা চালু কি না, তা আমার জানা নেই। এই ঘটনার সাথে পার্কের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমি ১০-১২ দিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। ওই পাড়ে পার্ক আছে কি না বা মালিক কে, তা আমি জানি না। ভাসমান সাঁকো পরিত্যক্ত হওয়ায় ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে কে বা কারা এর সংযোগ দিয়েছে, তা আমি অবগত নই।’ তদন্ত কমিটি গঠন ও পরবর্তী পদক্ষেপ  এই ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম আব্দুল্লাহ বিন রশিদকে প্রধান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুমী আক্তারকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিও রয়েছেন। জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, ‘গতকালকের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক। ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে, জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রবিউল ইসলাম আকন্দ জানান, পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং একজন আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। আর কোনো নিখোঁজের অভিযোগ না থাকায় শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।