১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ মার্চ প্রতিনিধি পরিষদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবটি বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। সে সময় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর হাতে। বাঙালিদের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক মনোভাব দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনায় ব্যর্থতা দেখা দেয়। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে এবং ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে ব্যাপকহারে নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সামাজিক কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তার পাঠানো বার্তায় ঘটনাগুলোকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত এক বার্তায় তিনি এবং মার্কিন কূটনীতিকদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতার প্রতিবাদ জানান। সেখানে বলা হয়, এই সংঘাতে ‘গণহত্যা’ শব্দটি প্রযোজ্য। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করলেও বিশেষভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। হত্যা, ধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও বিতাড়নের মাধ্যমে তাদের নির্মূলের চেষ্টা চালানো হয়। প্রস্তাবটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ চারটি বিষয় তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতার নিন্দা, ঘটনাগুলোকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, কোনো জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী না করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো ঘটনাগুলো স্মরণ ও নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংসতা প্রতিরোধ করা যায় এবং ভুক্তভোগীদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে। সূত্র: মার্কিন কংগ্রেসকেএএ/