শিক্ষক শূন্যপদ পূরণ: নির্দেশ আছে, বাস্তবতা কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সংকট, যা ধীরে ধীরে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তিন মাসের মধ্যে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক শূন্যপদ পূরণের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক এবং প্রয়োজনীয়। কারণ প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হওয়ার খবর উঠে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তিন মাসের মধ্যে কি সত্যিই এ সংকট দূর করা সম্ভব? বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এত সহজ নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি, যেখানে অনুমোদিত শিক্ষক পদের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার। কিন্তু কর্মরত শিক্ষক প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার। অর্থাৎ হাজার হাজার পদ এখনো খালি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মানে হলো, অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় কার্যত স্থায়ী নেতৃত্বহীন অবস্থায় চলছে। বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদানের তদারকি, শিক্ষকদের সমন্বয় সবকিছুই একজন প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে। সেই পদগুলো শূন্য থাকলে শিক্ষার মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় ২৪ হাজারের বেশি পদ খালি রয়েছে। এর ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। একদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হচ্ছে। ফলে পাঠদানের মান কমে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ সমস্যা আরও প্রকট। মাধ্যমিক শিক্ষার পরিস্থিতিও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ২১ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই বেসরকারি। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৯৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যার প্রায় ৯৩ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই এবং শিক্ষার পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার প্রায় ৫৫ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক এখনো পেশাগতভাবে পূর্ণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ অবস্থায় শিক্ষামন্ত্রীর তিন মাসের মধ্যে সব শূন্যপদ পূরণের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা প্রশাসনিকভাবে কতটা সম্ভব, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ শিক্ষক নিয়োগ একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। এতে নিয়োগবিধি সংশোধন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন গ্রহণ, পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, যাচাই-বাছাই, সুপারিশ এবং শেষে নিয়োগ এ ধরনের অনেক ধাপ রয়েছে। অনেক সময় এসব প্রক্রিয়া শেষ হতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এর সঙ্গে রয়েছে আইনি জটিলতা। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মামলা হয়েছে, যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির প্রক্রিয়া স্থগিত ছিল। আদালতের নির্দেশনা, নিয়োগবিধির সংশোধন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন এসব কারণে নিয়োগ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় তিন মাসের মধ্যে সব শূন্যপদ পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জটিলতা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিবন্ধন ও সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপায়ে এই নিয়ম এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। অনেক সময় চাহিদাপত্র পাঠানো হয় না, আবার কখনো নিবন্ধন সনদবিহীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এসব অনিয়ম শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে। শিক্ষকই শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিক্ষকের ওপর। যদি সেই শিক্ষকই না থাকে, তবে উন্নয়ন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব আলোচনা অর্থহীন হয়ে যায়। তাই শিক্ষক সংকট দূর করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেসরকারিভাবে পরিচালিত, তাই সেখানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যেখানে নিয়োগ ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে না। ফলে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে অনেক সময় অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পায়। গ্রাম ও শহরের শিক্ষার বৈষম্যও শিক্ষক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের অধিকাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শহরে অবস্থিত। ফলে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক সময় গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষক নিয়োগ হলেও তারা সেখানে দীর্ঘদিন থাকতে চান না। ফলে পদ শূন্যই থেকে যায়। এই সংকটের আরেকটি দিক হলো শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার আবার বেড়ে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। শিক্ষার মান কমে যাওয়া, শিক্ষক সংকট এবং আর্থিক চাপ এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। শিক্ষক সংকট এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাকে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি মূলত সমস্যাটিকে দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তব সমাধানের জন্য শুধু নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নীতিমালা। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা কমাতে প্রশাসনিক ধাপগুলো সরল করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না; তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকদের স্থায়ীভাবে কাজ করার জন্য প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা। সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং শিক্ষার ব্যয় কমানো- এসব পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তিন মাসের মধ্যে শিক্ষক সংকট দূর করার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি সরকারের সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এ সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এটি রাতারাতি সমাধানও সম্ভব নয়। প্রয়োজন ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ। শিক্ষকই শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শিক্ষকের ওপর। যদি সেই শিক্ষকই না থাকে, তবে উন্নয়ন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব আলোচনা অর্থহীন হয়ে যায়। তাই শিক্ষক সংকট দূর করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত। লেখক : ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর। এইচআর/জেআইএম