Somoy TV
পৃথিবীর শুরু থেকে নবী-রাসুলগণ ছাড়াও এমন কিছু মানুষের ধারাবাহিকতা বিদ্যমান, যারা শুধু উম্মাহকে নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন। যাদের সর্বদা চিন্তার কারণ হয় পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া। সেই সকল মহান সাধকদের অন্যতম, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহি. ও ক্বারী তৈয়্যব সাহেব রহি. এর বিশিষ্ট শাগরেদ আলহাজ্ব মুফতি হাবিবুর রহমান (বড় হুজুর) রহিমাহুল্লাহ।বড় হুজুর রহি. এর জন্ম ১৯১৮ ঈসায়ীতে। বিবাড়িয়া জেলার রসুলপুর গ্রামের সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে, পিতা রাহিমুদ্দীনের ঘরে। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন বি বাড়িয়া জেলার মালিহাতা মাদরাসায়। উচ্চ মাধ্যমিক জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়ায়। প্রতি ক্লাসে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে ইলমের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে দাখেলা নেন দারুল উলুম দেওবন্দে। জীবনের প্রতিটা অধ্যায়ে উস্তাগণের দুআ ও ভালোবাসা পাওয়া সৌভাগ্যবান মুফতি হাবিবুর রহমান দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদীস ও ইফতা সমাপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন। আল্লামা আতহার আলী রহ. এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে শিক্ষকতা শুরু করেন। জামিয়া ইমদাদিয়ায় পাঁচ বছর এবং বিবাড়িয়ার ষাইটশালা মাদরাসায় দু'বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন করে, উম্মাহ দরদী এই মানুষটি একসময় লক্ষ্য করলেন তার জন্মজেলা বিবাড়িয়া তো অনেক আগ থেকেই ইসলামের উর্বর ভূমি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ভৈরবে বিদআত ও কুসংস্কার এতটাই বেড়েছে যে মানুষেরা সঠিক দ্বীন থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। ব্যবসা বানিজ্য ও দুনিয়ার উন্নতি থাকার পরেও দ্বীনের সহিহ বুঝ না থাকায় মানুষগুলো জাহান্নামের দিকে ছুটছে। তিনি মর্মাহত হলেন। ভাবলেন কিভাবে এ মানুষগুলোকে সঠিক পথে সন্ধান দেওয়া যায়। আপন উস্তাদ ও শায়েখ আল্লামা দেলোয়ার হুসাইন রহ. (ফেনুয়া হজরতের) পরামর্শে তিনি ভৈরব আসেন। এবং ১৯৭৪ ইং মোতাবেক ১৩৮১ বঙ্গাব্দ ১লা বৈশাখ সোমবার ইসলামিয়া আরাবিয়া নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ দেশের অন্যতম বিদ্যাপিঠ জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম কমলপুর ভৈরব। কমলপুর মাদরাসার বর্তমান যে অবস্থান উন্নতি এর পুরোটাই বড় হুজুর রহ. এর দুআ, পরম যত্ন, অসামান্য ত্যাগ, রুহানিয়্যাত আর ইখলাসের ফসল। আরও পড়ুন: এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ. বড় হুজুর রহ. ভালো করেই বুঝেছিলেন ভৈরব থেকে বিদআত ও কুসংস্কার দূর করতে হলে দারুল উলুম দেওবন্দের শাখা তৈরির বিকল্প নেই। কমলপুর মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন মাদরাসার জন্য। হুজুর নিজে মাটি কেটে দিতেন আর কমিটির সদস্যরা তা বহন করতেন। পরিবার পরিজন থেকে মাদরাসার প্রতি দরদ ছিল শতগুণ। পারিবারিক দূরাবস্থার কারনে কমিটির সদস্যরা একবার বেতন বাড়াতে চাইলে হুজুর রাগ করে বলেন,আমার যখন সমস্যা হবে আমি নিজেই বলব। হুজুরের দীপ্তিময় জীবন ও এমন শত ত্যাগের ঘটনা আজও মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এবং স্মরণ করবে, ইনশাআল্লাহ! মুফতি হাবিবুর রহমান এর বড় হুজুর হয়ে ওঠার পিছনে সবচে বড় অবদান ছিল তার উস্তাদদের।তার উস্তাদগণ ছিলেন ঐ সময়কার প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব, ইলম ও রুহানিয়্যাতে যাদের অবস্থান ছিল ঈর্ষনীয়। শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ., ক্বারী তৈয়্যব সাহেব রহ., আল্লামা দেলোয়ার হুসাইন রহ. (ফেনুয়া হুজুর), রইসুল মুফাসসিরীন আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রহ., মালিহাতার বড় হুজুর মাওলানা মুহাম্মদ আলী রহ. প্রমুখ ছিলের তাঁর উস্তাদ। বড় হুজুর রহ. ছাত্র গড়তে জানতেন। বুঝতেন তাদের মন ও মনন। ছাত্রদের প্রতি তাঁর স্নেহ ভালোবাসার অতুলনীয়। মুনাযিরে আ'যম আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী হাফি., আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ হাফি., মুফতি মুহসিনুল করিম হাফি. ছিলেন তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। এই মহান মনীষী ৯৫ বছর বয়সে দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭ আগষ্ট ২০১৩ সালে বুধবার রাত ৯ টায় আপন মাহবুবের সান্নিধ্যে গমন করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)। পরদিন সকালে নিজহাতে গড়া জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম কমলপুরের মাঠে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শত শত আলেম উলামা, ছাত্র শিক্ষক, মুহিব্বিন ও আত্মীয় স্বজনরা বিদায় জানান তাদের প্রিয় বড় হুজুরকে। মৃত্যুর মাধ্যমে জায়গার পরিবর্তন হলেও তিনি আমাদের চেতনা ও প্রেরণার মিনারা হয়ে জীবন্ত থাকবেন যুগের পর যুগ। ❝যতদিন থাকবে কমলপুর জামিয়া থাকবে তাঁর সন্তান আমাদের বড় হুজুর একজনই মুফতি হাবিবুর রহমান। ❞লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম কমলপুর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ।
Go to News Site