শহরের নীরব যোদ্ধা রিকশাওয়ালা
Jagonews24

শহরের নীরব যোদ্ধা রিকশাওয়ালা

শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন ছুটে চলছে হাজার হাজার রিকশা। তিন চাকার ওই বাহন যেন কতো কতো অদৃশ্য গল্পের বাহক। সেই চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে আরও অনেক জীবন জড়িত। জড়িয়ে থাকে অসংখ্য রিকশাওয়ালার হাসি-কান্না, সংগ্রাম আর স্বপ্ন। যাত্রীরা যখন গন্তব্যে যেতে আরামের একটি রিকশা খোঁজেন, তখন হয়তো জানা হয় না ওই রিকশাটা বয়ে নেওয়া মানুষটার জীবন কেমন? কতটা কষ্ট, কতটা ত্যাগ লুকিয়ে আছে ওই জীবননামায়? একজন রিকশাওয়ালার জীবন কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রত্যেক রিকশাওয়ালাই প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং জীবিকার সংগ্রামের এক বাস্তব আখ্যান। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর শহরের রাস্তায় রিকশা চালিয়ে, জরাজীর্ণ শরীরেও তারা পরিবার ও সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার লড়াই চালিয়ে যান। তাদের জীবন যেন অনিশ্চয়তা ও কঠোর বাস্তবতার সংমিশ্রণ, যেখানে ঘাম আর কষ্টের দাম সবসময় পাওয়া যায় না। একাধিক রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ রিকশাওয়ালার দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই। অনেকেই রাতভর রিকশা চালান, আবার কেউ কেউ ভাড়া নিয়ে রিকশা চালান সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা অবধি। এর মধ্যে বিশ্রামও নিতে হয়, খেতে হয়, প্রয়োজনও সারতে হয়। শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় বা বস্তিতে বসবাস করে অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেন একেকজন রিকশাচালক। আবার, ঢাকার অনেক রিকশাচালকই বাসা ভাড়া নেন না, কারণ তাদের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন। এমন রিকশাওয়ালাদের কাছে রিকশাটাই যেন বিছানা। ক্লান্ত শরীর যখন আর টানতে পারে না, তখন রিকশার সিটেই গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েন। শহরের ফুটপাত, গ্যারেজ কিংবা কোনো নির্জন কোণে তাদের বিশ্রামের স্থান হয়ে ওঠে। বলা চলে, ‘যেখানে রাত-সেখানেই কাত’, ‘যেখানেই ক্লান্ত, সেখানেই দেহ হয় শান্ত’। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে রিকশা চালানো মানে শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়, মানসিক চাপও আছে। রোদ, বৃষ্টি, যানজট সবকিছুকে উপেক্ষা করে তারা ছুটে চলেন। দুপুরের তীব্র গরমে যখন শহরের মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বিশ্রাম নেয়, তখন রিকশাচালকরা ঘাম ঝরায় রাস্তায়। ক্ষুধা পেলে রাস্তার পাশের সস্তা কোনো হোটেল বা ফুটপাত থেকে খাবার কিনে খান। সেই খাবারও সবসময় ক্ষুধার তুলনায় কম হয়। তবে আশার কথা, তাদের জীবনে শুধু সংগ্রামই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও পরিকল্পনাও থাকে। কথা বলে জানা যায়, অনেক রিকশাচালক সামান্য আয় থেকেও কিছু টাকা সঞ্চয় করার চেষ্টা করেন। নিজে রিকশা চালিয়ে কোনোমতে থেকে বাড়িতে টাকা পাঠান। কেউ কেউ ডিপিএস করেন, কেউ জমা রাখেন গ্রামের সমিতি বা ব্যাংকে। ওই সামান্য সঞ্চয়ের মধ্যেই তারা আশার আলো খোঁজেন। আরও পড়ুন:  ওরা যেন সমুদ্রের ঘোড়া চন্দনারা কই? যে ভোরে জেগেছিল বাংলাদেশ উপকূলের জন্য শুরু হলো ‘বিপদসংকুল সময়’ মতিঝিল এলাকার এক রিকশাচালক আব্দুল করিম। জীবনের গল্প বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা তো কষ্ট করতেই জন্ম নিয়েছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালাই। কখনো ১২ ঘণ্টা, কখনো ১৬ ঘণ্টাও হয়ে যায়। খাই রাস্তার পাশেই। বাসা ভাড়া নিলে সংসার চালাতে পারবো না। তাই অনেক সময় রিকশাতেই ঘুমাই।’ জীবনের প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই, আছে কেবল মেনে নেওয়ার এক নীরব স্বর। প্রতিদিনের আয়-রোজগার দিয়ে তাকে শুধু নিজের নয়, গ্রামের পরিবারেরও খরচ চালাতে হয়। রিকশাচালক আব্দুল করিমের দুই সন্তান গ্রামের স্কুলে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে চাই। তারা যেন আমার মতো কষ্ট না করে। এজন্য যত কষ্টই হোক, টাকা জমাই।’ গুলিস্তান এলাকার আরেক রিকশাচালক রহিম উদ্দিন। বলেন, ‘দিনে আয় হয় কখনো ৫০০ টাকা, কখনো ৭০০, আবার কখনো হাজার টাকা। কিন্তু, সবটাই নিজের থাকে না। গ্যারেজে ভাড়া দিতে হয়, খাওয়ার খরচ আছে। তারপর যা থাকে, তা গ্রামের বাড়িতে পাঠাই। আমি একটা ডিপিএসও করেছি, যাতে ভবিষ্যতে কিছু টাকা থাকে। যদিও প্রতিদিনের আয় নিশ্চিত না। অনেক সময় রিকশার ভাড়া টাকাই ওঠে না।’ রিকশাওয়ালাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হলো তাদের ত্যাগ। নিজেরা না খেয়ে থেকেও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। অনেক সময় নিজের পরার কাপড়টুকুও কিনতে পারেন না বা কেনেন না, কিন্তু ঈদের সময় সন্তানদের জন্য নতুন জামা কিনতে ভুল করেন না। নিজের কষ্টের কথা তারা লুকিয়ে রাখেন, কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের স্বপ্ন অটুট। রিকশাচালকদের জীবন শুধুই পরিশ্রমের নয়, এটি এক অবিরাম সংগ্রামের গল্প। প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানোর সঙ্গে তারা যেন লড়াই করেন দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। তবুও তারা হার মানেন না। প্রতিদিন নতুন করে শুরু করেন, নতুন করে আশার আলো খোঁজেন। এই মানুষগুলো আমাদের সমাজের নীরব যোদ্ধা। তাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় তারা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আমরা কতটা ভাবি? সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নাগরিক অধিকার’ এর কার্যনির্বাহী সদস্য সাইমুল ইসলাম রাব্বি মনে করেন, সবার উচিত একজন শ্রমজীবীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া। সামান্য সৌজন্য, একটু মানবিক আচরণও তাদের জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভাড়া নিয়ে অযথা তর্ক না করে, তাদের পরিশ্রমের মূল্য বোঝা উচিত। পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও উচিত তাদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। রিকশাচালকদের জীবন আমাদের বড় শিক্ষা দেয় কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য আর স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাদের এই সংগ্রামী জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। রিকশার চাকার মতোই ঘুরছে তাদের জীবন। কিন্তু এই ঘূর্ণনের মাঝেও তারা থেমে থাকেন না। কারণ তারা জানেন এই পথ চলার শেষেই হয়তো অপেক্ষা করছে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ, যেখানে তাদের সন্তানেরা আর রিকশা চালাবে না, বরং মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে একটি আলোকিত জীবনের পথে। জেএস/

Go to News Site