Jagonews24
দেশের স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু বরাদ্দ ১০০ ডলারে উন্নীত করা এবং সারাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ শয্যায় রূপান্তর করার দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে ‘জাতীয় হেলথ বাজেট ২০২৬-২০২৭’ এর ওপর আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সংগঠনটির নেতারা এ দাবি জানান। ‘ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)’ আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য সংকট, বাজেট কাঠামো, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং সুশাসন নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে সংসদ সদস্য, প্রবীণ চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন। এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ডা. মো. মিজানুর রহমান। মূল প্রবন্ধে ডা. মিজানুর রহমান দেখান, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশকৃত ৫ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। ফলে দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণকে নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলছে। প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেউদ্দীন ফরিদ বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের ৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে না পেরে ফেরত চলে যায়। বাজেটের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। কাগজে-কলমে চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও বাস্তবে সংকট তীব্র। আমাদের মূল সমস্যায় হাত দিয়ে সমাধানের দিকে যেতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংসদ সদস্য সাবেকুন নাহার বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাস্থ্যখাত। সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবে এই খাতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। আলোচনায় বক্তারা বিশ্ববাজারের তুলনা টেনে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ মাত্র ৫০-৬০ ডলার। সেখানে মালদ্বীপে ১০০০-১২০০ ডলার এবং আমেরিকায় ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কম বরাদ্দের কারণে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও তা চালানোর মতো দক্ষ লোকবল নেই। টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনে এনডিএফের ১০ দফা সুপারিশ ১. সরকারি স্বাস্থ্য বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ৪-৫ শতাংশে উন্নীত করা। ২. উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং মাথাপিছু বরাদ্দ ১০০ ডলার করা। ৩. ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করা। ৪. জেলা পর্যায়ে আইসিইউ, এনআইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র সম্প্রসারণ। ৫. চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বাড়িয়ে গ্রামীণ চিকিৎসকদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া। ৬. ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) ও টেলিমেডিসিন চালু করা। ৭. সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। ৮. মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী স্বাস্থ্যসেবাকে বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া। ৯. এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ভিত্তিক আধুনিক স্বাস্থ্যখাত গড়ে তোলা। ১০. স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। সমাপনী বক্তব্যে এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি কলেজের মতো বেসরকারি মেডিকেল কলেজের বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদেরও বিশেষ অ্যালাউন্স দেওয়ার দাবি জানান তিনি। গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. এম এ সবুর, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালাইন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. দিদারে আলম মহসিন, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী তাসলিমা, গবেষক নাজমুল হাসান এবং সাংবাদিক হামিম উল কবির। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সরাও উপস্থিত ছিলেন। এসইউজে/এসএনআর
Go to News Site