Jagonews24
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন রাশেদ আলী। মাস শেষে বেতন পান ৪৮ হাজার টাকা। কয়েক বছর আগেও এই আয়ে ছোট্ট সংসারটি কোনোভাবে সামলে নিতে পারতেন। ছেলে-মেয়ের স্কুল, বাসাভাড়া, বাজার, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ—সব মিলিয়ে কষ্ট হলেও জীবন চলত। কিন্তু এখন মাসের মাঝামাঝি এলেই তাকে হিসাবের খাতা নিয়ে বসতে হয়। গত ঈদে ছেলেকে নতুন জমা কিনে দিতে পারেননি। কয়েকদিন আগে মেয়েটি ফল খেতে চাইলে তিনি কৌশলে বিষয়টা এড়িয়ে গেছেন। রাতে স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার পর একা বসে তিনি মোবাইলের ক্যালকুলেটরে বারবার হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন—কোথায় কমাবেন, কীভাবে চলবেন। অথচ বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবেও না, এই মানুষটাই প্রতিদিন নীরবে ভেঙে পড়ছেন। রাশেদ আলীদের মতো সমাজের সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা শ্রেণিটির নাম সম্ভবত মধ্যবিত্ত। তারা না গরিব, না ধনী। তাই তাদের কষ্টও যেন দৃশ্যমান নয়। রাষ্ট্রের সহানুভূতির বড় অংশ যায় দরিদ্র মানুষের দিকে, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। আবার ধনীরা নিজেদের অর্থ ও প্রভাব দিয়ে সংকট সামলে নেয়। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্ত মানুষগুলো প্রতিদিন এক অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ে যায়—নীরবে, নিঃশব্দে। এই শ্রেণির মানুষের কান্না সাধারণত প্রকাশ পায় না। কারণ তারা অভ্যাসগতভাবে মুখ লুকিয়ে বাঁচতে শেখে। সংসারে টান পড়লেও তারা আত্মসম্মানের কারণে কারও কাছে হাত পাততে পারে না। সন্তানদের সামনে অসহায় হতে চায় না। সমাজের সামনে নিজেদের ভাঙা অবস্থাও দেখাতে পারে না। ফলে তাদের কষ্টগুলো ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই বন্দি থাকে। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্থিতিশীলতা। সীমিত আয়ে হলেও তারা হিসাব করে চলত। মাস শেষে হয়তো কিছু টাকা সঞ্চয়ও করতে পারত। সন্তানদের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, ছোটোখাটো স্বপ্ন—সব মিলিয়ে জীবনটা কষ্টের হলেও নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ভারসাম্য ভয়াবহভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত আজ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। বাজারে গেলে মানুষ এখন আগের মতো তালিকা ধরে কেনাকাটা করতে পারে না। অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। মাছ, মাংস, দুধ, ফল— যা একসময় নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ছিল, এখন অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। শিশুর পুষ্টি, বয়স্কদের ওষুধ কিংবা পরিবারের স্বাভাবিক চাহিদা—সবকিছুর মধ্যেই এখন হিসাব আর সংকোচ। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে যে মাসের বেতন হাতে পাওয়ার আগেই যেন তার গন্তব্য ঠিক হয়ে যায়। একটি চাকরিজীবী পরিবার আজ সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকে মাসের শেষ সপ্তাহ নিয়ে। বেতনের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অথচ মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা এমন যে তারা হুট করে গ্রামে চলে যেতে পারে না, আবার জীবনযাত্রার মানও সহজে কমাতে পারে না। রাষ্ট্রকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গণপরিবহন, বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। কারণ মধ্যবিত্ত শুধু একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়, এটি একটি দেশের সামাজিক ভারসাম্যের প্রতীক। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো মানসিক চাপ। একজন মধ্যবিত্ত বাবা প্রতিদিন ভাবেন সন্তানের স্কুলের বেতন কীভাবে দেবেন। একজন মা চিন্তা করেন রান্নাঘরের খরচ কীভাবে সামলাবেন। একজন তরুণ চাকরিজীবী ভাবেন—এই আয়ে বিয়ে, সংসার কিংবা ভবিষ্যৎ আদৌ সম্ভব কি না। আর অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরা ভাবেন ওষুধ কিনবেন, নাকি সংসারের অন্য খরচ চালাবেন। মধ্যবিত্তের এই নীরব সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিকও। কারণ দীর্ঘমেয়াদে হতাশাগ্রস্ত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। ইতিহাস বলে, যে কোনো দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। এই শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজে হতাশা বাড়ে, মূল্যবোধ ক্ষয় হয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমানে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের স্বপ্ন ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ সন্তানের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন ছেড়ে দিচ্ছে, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, কেউ আবার শখ-আহ্লাদ পুরোপুরি ভুলে গেছে। এমনকি ঈদ-পার্বণের আনন্দও এখন অনেক পরিবারের কাছে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন পোশাক কেনার আগে মানুষ এখন বিদ্যুতের বিলের হিসাব করে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই শ্রেণির মানুষের জন্য কার্যকর কোনো সুরক্ষা কাঠামো খুব একটা নেই। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ অনেক সময় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আসে না। অথচ কর দেয়, নিয়ম মেনে চলে, রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখে মূলত এই শ্রেণির মানুষই। এখন সময় এসেছে মধ্যবিত্তের বাস্তবতা নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবার। শুধু উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের জীবন বোঝা যায় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। মানুষের মুখে হাসি না থাকলে উন্নয়নের চকচকে গল্পও একসময় ম্লান হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গণপরিবহন, বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। কারণ মধ্যবিত্ত শুধু একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়, এটি একটি দেশের সামাজিক ভারসাম্যের প্রতীক। মধ্যবিত্ত মানুষগুলো খুব বেশি কিছু চায় না। তারা শুধু সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়, সন্তানদের ভালো রাখতে চায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে সামান্য নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু আজ সেই সামান্য নিশ্চয়তাটুকুও যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এই নীরব কান্না শোনা জরুরি। কারণ মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস একসময় পুরো সমাজের ওপরই ছায়া ফেলে। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com এইচআর/এমএফএ/জেআইএম
Go to News Site