Collector
স্যালুট মানবতার ক্লান্তিহীন অভিযাত্রীকে | Collector
স্যালুট মানবতার ক্লান্তিহীন অভিযাত্রীকে
Jagonews24

স্যালুট মানবতার ক্লান্তিহীন অভিযাত্রীকে

কিছু মানুষ পৃথিবীতে শুধু নিজেদের জন্য বাঁচেন না। তারা বেঁচে থাকেন অন্যের চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য। ক্ষুধার্ত মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর জন্য। পেশায় প্রকৌশলী হলেও রক্তে যার মানবিকতার টান, তিনি নাসির উদ্দিন। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, সময় কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার হিসাব না কষে তিনি ছুটে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে—শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অদম্য তাগিদে। পৃথিবীর যেখানেই মানবতা বিপন্ন, যেখানেই প্রকৃতির নিষ্ঠুর আঘাত, সেখানেই যেন দেখা মেলে এই নীরব সৈনিকের। তার এই মানবিক যাত্রার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। কিশোরগঞ্জের অবহেলিত গোরখোদক মনু মিয়ার ভাঙা ঘরে আশার আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলের অসহায় মানুষের জীবনসংগ্রাম-সবখানেই পৌঁছে গেছে তার সহমর্মিতার হাত। দেশ ছাড়িয়ে তার এই ভালোবাসার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ জনপদ, তুরস্কের ভয়াবহ ভূমিকম্প, সুদানের গৃহযুদ্ধ, নেপালের বন্যা কিংবা আফগানিস্তানের তীব্র শীতের আর্তনাদ—মানবতার আহ্বান যেখানেই এসেছে, প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন সেখানেই ছুটে গেছেন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। গত তিন বছর ধরে কুরবানির ঈদ এলেই এক চিলতে আনন্দ বিলিয়ে দিতে তিনি ছুটে আসেন মিশরে। উদ্দেশ্য—নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত, কায়রোতে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মাঝে কুরবানির মাংস তুলে দেওয়া। স্বজনহারা, ঘরবাড়ি হারানো এই মানুষগুলোর ঈদ বলতে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু নাসির উদ্দিনের মতো মানুষেরা যখন তাদের মাঝে এসে দাঁড়ান, তখন তারা খুঁজে পান বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কায়রোতে পা রেখেই তিনি স্থানীয় বাজার ঘুরে কুরবানির জন্য কিনেছেন বিশাল আকৃতির দুটি উট। গতকাল সন্ধ্যায় কায়রোর ঐতিহাসিক রামসিস হোটেলে তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেলো এক আবেগময় তথ্য। শুধু দুটি উটই নয়, তার পরিকল্পনা রয়েছে আরও কয়েকটি পশু কেনার। লেখকের সঙ্গে প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন/ফাইল ছবি তিনি যখন বলছিলেন, এই মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধের বিভীষিকা দেখছে। ঈদে একটু ভালো খাবার খাওয়া তো দূরের কথা, দুবেলা বেঁচে থাকাই তাদের জন্য সংগ্রাম। আমি শুধু চেষ্টা করছি এই আনন্দের দিনে যেন তারা নিজেদের একা না ভাবেন। তখন তার চোখে ছিল এক অন্যরকম তৃপ্তির আভাস। সাধারণত মানুষ ছুটির দিনগুলোতে বা ঈদের মতো বড় উৎসবে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, পরিবারের সান্নিধ্য ত্যাগ করে পড়ে থাকেন দূর পরবাসে, অচেনা সব মানুষের মাঝে। তার এই মিশনের কোনো স্পন্সর নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ। আছে শুধু এক বুক ভালোবাসা। যখন উটের মাংসের প্যাকেট হাতে পেয়ে ফিলিস্তিনি কোনো বৃদ্ধা বা শিশু ডুকরে কেঁদে ওঠে এবং অবোধ্য ভাষায় আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করে, তখনই নাকি নাসির উদ্দিন তার সমস্ত ক্লান্তির অবসান খুঁজে পান। আজকের এই আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে প্রকৌশলী নাসির উদ্দিনের মতো মানুষেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন—মানুষ এখনো মানুষের জন্য। তিনি কোনো পদক বা প্রচারণার আশায় কাজ করেন না। তিনি মানবতার এক নীরব ফেরিওয়ালা, যিনি পৃথিবীর প্রতিটি অন্ধকার কোণে ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে দিতে চান। যুদ্ধ, ক্ষুধা আর বঞ্চনায় ক্লান্ত মজলুম মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর এই মহৎ উদ্যোগ সার্থক হোক। স্যালুট মানবতার এই ক্লান্তিহীন অভিযাত্রীকে! এমআরএম

Go to News Site