Collector
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা | Collector
দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা
Jagonews24

দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা

জীবনমুখী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন। যেখানে আনন্দের সঙ্গে শিখবে শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী যেন ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সেজন্য শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারে জোর দিয়েছে সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী অঙ্গীকারও ছিল এমনই। তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। শিক্ষার সব স্তরের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। তিনি গড়তে চান একটি আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়াপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাকে তাই তিনি দেখেন জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবেই। সুকুমারবৃত্তির চর্চার মাধ্যমে একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীর মৌলিক মূল্যবোধ সৃষ্টির এই প্রথম ধাপেই সর্বোচ্চ মনোযোগী হয়ে জাতির ভবিষ্যৎ গঠন ও উন্নয়নের সোপানও তৈরি করতে চান সরকারপ্রধান। দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ করে তোলার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতাও একবার সংসদে তুলে ধরেছিলেন সংসদ নেতা। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে আমাকে বহু বছর ব্রিটেনে থাকতে হয়েছে। সেই সময় সেই স্কুলগুলোকে দেখতাম, স্কুলের বাচ্চাদের দেখতাম। এই বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছি বলেই খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হতো আমার দেশের স্কুলগুলো কেন এমন হতে পারে না? আমি যেখানে থাকতাম তাঁর আশপাশে প্রাইমারি স্কুল ছিল। বাচ্চারা সুন্দর কাপড় পড়ে যাচ্ছে, পায়ে জুতো। মনের মধ্যে একটি কষ্ট হতো আমার দেশের প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চারা কবে এভাবে সুন্দরভাবে স্কুলে যাবে? প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের যাদের চিনতাম তারা দেখতাম কী সুন্দরভাবে বাচ্চাদের ক্লাসে শিক্ষাদান করছে। আমরা ইনশাআল্লাহ আগামী জুলাই মাস থেকে প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের স্কুল ড্রেস ও জুতার ব্যবস্থাও করবো।’ নির্বাচনী ইশতেহারের পর প্রধানমন্ত্রীর এমন অভিজ্ঞতা বিনিময় সেদিন কার্যত দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শুরু থেকেই শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আসন্ন বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উন্নীত করা হচ্ছে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিপি) শিক্ষা খাতে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার আধুনিকায়ন, যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষকের দক্ষতার মানোন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার শুরু করতে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রাও। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিটি উপজেলায় ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ চালুরও। তিন বছরের জন্য তৈরি হচ্ছে একটি বিশেষ ‘ফিসকাল আপলিফট প্ল্যান’। ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ (পিইডিপি-৫) এর আওতায় পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচির প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক কর্মসূচির পিইডিপি-৫ আওতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় গণিতে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি মৌলিক সাক্ষরতার বিষয়টিও বিশেষ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। থাকবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ নামে একটি কর্মসূচিও। যার মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প। গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান নিশ্চিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক উদ্যোগ। প্রাথমিক শিক্ষাকে কার্যকর, উপভোগ্য ও সহজলভ্য করার পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে নতুন এক সংযোজন। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ সক্ষমতায় দ্রুত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা গড়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের। যেখানে শিক্ষকরাও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে আরও আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় ও কার্যকর করতে ভিডিও, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল স্লাইড ও ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্টের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলতে পারবে, যা শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই মনে রাখতে পারবে। এই প্রকল্পের আওতায় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার শিক্ষকের হাতে পৌঁছবে ট্যাব। মাস দুয়েক আগে ‘নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষা খাত: নতুন চিন্তা, নতুন কাঠামো ও নতুন পদক্ষেপ’ শীর্ষক সংলাপে বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের ভর্তি হার একসময় প্রায় ৯৮ শতাংশে পৌঁছালেও ২০২৪ সালে তা কমে প্রায় ৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হারও সন্তোষজনক নয়।দারিদ্র্য ও সামাজিক ঝুঁকির কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই উপার্জনের কাজে যুক্ত হচ্ছে। দেশে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছিলেন, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্পটি শুধুমাত্র একটি ডিভাইস বিতরণ প্রকল্প নয়।’ বরং একে ‘শিক্ষণ-শেখার অপারেটিং সিস্টেম’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ট্যাবে পাঠ-পরিকল্পনার টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক এবং লার্নিং এভিডেন্স আপলোডের সুবিধা থাকবে। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘লার্নিং উইথ প্লে’ বা ‘খেলতে খেলতে শিক্ষা’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের কথাও বলেছেন। শিক্ষাখাতের উন্নয়নে কারিকুলাম, ক্লাসরুম ও কনসিসটেন্সি ঠিক করতে চান প্রতিমন্ত্রী। ক্লাসরুমের অবকাঠামো ও পরিবেশের উন্নয়ন করার কাজেও হাত দিয়েছেন। এছাড়াও শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ মডিউলে শিখন-শেখানো কৌশল, শিক্ষাক্রম পরিচালনা ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো পাটের তৈরি স্কুল ব্যাগ ও ড্রেস পাচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। আগামী জুলাই থেকে প্রতি মাসে দু’টি করে উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু হবে। প্রতিটি উপজেলায় দুটি করে বিদ্যালয় বাছাই করে প্রথমে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাগ ও ড্রেস বিতরণ করা হবে। চলতি অর্থবছরেই বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস পাবেন প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী। পরে ধাপে ধাপে অন্য শ্রেণিতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। গত বুধবার (২২ এপ্রিল) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এই বিষয়ে বলেন, ‘দেশীয় পণ্য শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং মেড ইন বাংলাদেশ উদ্যোগকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ এছাড়াও সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর মিড-ডে মিল চালুর কার্যক্রম। শিক্ষাখাতে সামাজিক ও ভৌগলিক বৈষম্য হ্রাস, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত, সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ, ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি, আনন্দময় শিক্ষা, সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা উন্নয়ন, সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক, সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা সৃষ্টিতে গুরুত্বারোপ, শিক্ষকদের অবসর ভাতা প্রাপ্তি সহজীকরণের বিষয়ও সমান তালে করতে চায় সরকার। প্রাথমিকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও বাস্তবমুখী নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে চালু করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের চাহিদা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের বাস্তবতায় নতুন এই শিক্ষাক্রম প্রণয়ণের কাজ চলছে। যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে বা ক্লাসে তাল মেলাতে পারছে না, তাদের জন্য বিশেষ সহায়ক কার্যক্রম চালুর ভাবনা-চিন্তা চলছে। লার্নিং সার্কেল, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা, অভিভাবক অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কনটেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা যেন প্রাথমিক শিক্ষার খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার বার্তাই দিচ্ছে। লেখক: পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। mamunzi859@gmail.com এইচআর/এমএস

Go to News Site