Jagonews24
কেরবানির ঈদ সামনে এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় কামার পাড়ায়। বছরের অন্য সময় তুলনামূলক ধীরগতিতে চললেও ঈদুল আজহার আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কামারের দোকানগুলোতে এখন ব্যস্ততার শেষ নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের ভাটিতে লোহা পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে ছুরি, দা, চাপাতি, কাচি ও বটি। হাতুড়ির টুংটাং শব্দ আর আগুনের ঝলকে মুখর হয়ে উঠেছে কাওরানবাজার ও খিলগাঁওয়ের কামারপট্টি। রাজধানীর কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট দোকানে কর্মচাঞ্চল্য তুঙ্গে। কেউ লোহা গরম করছেন, কেউ ধার দিচ্ছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের পালিশে ব্যস্ত। দোকানের সামনে সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতারা। কেউ নতুন ছুরি কিনছেন, কেউ পুরোনো দা ধার করাতে এসেছেন। কারওয়ানবাজারের কামার বিশ্বজিৎ ঘামে ভেজা শরীরে হাতুড়ি চালাতে চালাতে বলেন, ঈদের আগে প্রায় এক মাস আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সকাল ৮টা থেকে অনেক সময় রাত ২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এখন প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ৬০টা ছুরি ও দা বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও দেশীয়ভাবে তৈরি ছুরির চাহিদা বেশি ছিল। তবে এখন চায়না ও স্টিলের কারখানায় তৈরি পণ্যের কারণে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। তারপরও অনেকেই হাতে তৈরি দেশীয় অস্ত্রের প্রতি আস্থা রাখেন। আমাদের তৈরি জিনিস টেকসই হয়। একবার কিনলে কয়েক বছর ব্যবহার করা যায়। একই এলাকার আরেক কামার জামাল জানান, এবার কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। লোহার দাম, কয়লার দাম, শ্রমিকের মজুরি সবই বেড়েছে। তারপরও আমরা খুব একটা দাম বাড়াইনি। কারণ মানুষ এখন হিসাব করে খরচ করছে। তিনি জানান, তার দোকানে বিভিন্ন আকারের ছুরি ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বড় দা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ হাজার টাকায়। এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মাঝারি সাইজের ছুরি। মানুষ গরু ও খাসির জন্য আলাদা আলাদা ছুরি নিচ্ছে। খিলগাঁও এলাকার কামার রহিম উদ্দিনের দোকানেও একই চিত্র। দোকানের ভেতরে কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে কাজ করছেন। কেউ আগুনে লোহা গরম করছেন, কেউ পাথরে ধার দিচ্ছেন। রহিম উদ্দিন বলেন, ঈদের আগে আমাদের ঘুমানোরও সময় থাকে না। অনেক ক্রেতা শেষ মুহূর্তে এসে তাড়া দেন। তিনি জানান, এখন শুধু ছুরি বিক্রি নয়, পুরোনো দা ও চাপাতি ধার দেওয়ার কাজও অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ ধার করাতে আসছেন। অনেকে নতুন না কিনে পুরোনো জিনিস ঠিক করেই ব্যবহার করতে চান। কারওয়ানবাজারে ছুরি কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুব হাসান বলেন, গত বছর একটি ছুরি কিনেছিলাম, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তো আবার কিনতে আসলাম। বাজারে অনেক রেডিমেড জিনিস পাওয়া যায়, কিন্তু কামারের হাতে তৈরি ছুরির ধার ও মান ভালো। তিনি জানান, এবার একটি মাঝারি ছুরি ও একটি দা কিনতে আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি খরচ হয়েছে। তারপরও ভালো মানের জন্য তিনি দেশীয় পণ্যই বেছে নিয়েছেন। খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সালমা আক্তার স্বামীর সঙ্গে ছুরি কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, কোরবানির সময় ভালো ধারালো ছুরি না হলে কাজ করতে সমস্যা হয়। তাই একটু বেশি দাম হলেও ভালো জিনিস নেওয়ার চেষ্টা করি। দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে দোকানিরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন আগে যে ছুরি ৫০০-৬০০ টাকা ছিল, এখন তার দাম চাচ্ছে ৮০০ টাকা। নতুন ছুরির পাশাপাশি, পুরোনো ছুরির ধার দেওয়ার খরচও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের ছুরি ধার দিতে যে টাকা নেওয়া হয়, এখন তার দ্বিগুণ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কারওয়ানবাজারে পুরোনো দা ধার করাতে আসা রিকশাচালক আবুল কালাম বলেন, নতুন কিনতে গেলে খরচ বেশি। তাই পুরোনো দাটাই ধার করিয়ে নিচ্ছি। এতে কম টাকায় কাজ হয়ে যায়। তিনি জানান, ঈদের সময় পরিবারের সবাই মিলে কোরবানির কাজ করেন। তাই ভালো ধার থাকা জরুরি। ধার না থাকলে মাংস কাটতে অনেক কষ্ট হয়। খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী প্রদীপ বলেন, আগে গ্রামের বাড়ি থেকে অনেক দক্ষ কারিগর মৌসুমি কাজের জন্য ঢাকায় আসতেন। কিন্তু এখন এই পেশায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। কঠোর পরিশ্রম, কম লাভ এবং আধুনিক কারখানার তৈরি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে অনেকে পেশা বদল করছেন। তবুও বছরের এই সময়টুকু তাদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করে। ঈদ ঘিরে বাড়তি আয়ে সংসারের কিছুটা স্বস্তি ফেরে। কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগান, কেউ পুরোনো ঋণ শোধ করেন- বলেন প্রদীপ। ধার দেওয়ার জন্য এখন বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারওয়ানবাজারের কামার বিশ্বজিৎ বলেন, সারা বছর কষ্ট করি এই সময়টার আশায়। ঈদের আগে কাজ ভালো হলে পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে থাকা যায়। স্বাভাবিক সময়ে আমরা যে টাকা রাখি, এখনও তাই রাখছি। হয় তো কেউ কেউ ক্ষেত্র বিশেষে একটু বেশি টাকা নিতে পারে। খিলগাঁওয়ে একটি মুদিদোকানি মো. সাইফুল বলেন, কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি অনেক মানুষের জীবিকারও বড় উৎস। এই সময় কামারদের আয় বাড়ে। তাদের দোকানে কাজের চাপ দেখলেই বোঝা যায় ঈদ চলে এসেছে। এমএএস/এমআইএইচএস/
Go to News Site