Collector
Giriş Yap
নরমাল ডেলিভারির জন্য যেসব প্রস্তুতি সহায়ক হতে পারে | Collector
নরমাল ডেলিভারির জন্য যেসব প্রস্তুতি সহায়ক হতে পারে

নরমাল ডেলিভারির জন্য যেসব প্রস্তুতি সহায়ক হতে পারে

গাজীপুরের গৃহিণী জান্নাতুল মাওয়ার প্রথম সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। ২০১৯ সালে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট দেখে একজন চিকিৎসক তাকে সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেন। যদিও তখনও সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ আসতে এক মাসেরও বেশি সময় বাকি ছিল। মাওয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তার সন্তানের সম্ভাব্য জন্মতারিখ ছিল ১৪ জুন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে ৫ মে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানোর পর চিকিৎসক জানান, গর্ভের পানি কমে গেছে এবং দ্রুত সিজার করতে হবে। পরে ১৮ মে অপারেশনের তারিখও নির্ধারণ করা হয়। তবে পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়টি কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়। কারণ, যদি পরিস্থিতি এতটাই জটিল হতো, তাহলে দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করার কথা নয়। এ কারণে মাওয়ার পরিবার তাকে চাঁদপুরে নিয়ে যায় এবং সেখানে সরকারি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে পুনরায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়। সেখানকার চিকিৎসকরা আগের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানান, পানির পরিমাণ সামান্য কম হলেও তা স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে কোনো বড় বাধা নয়। তারা মাওয়াকে প্রসববেদনা শুরু হলে হাসপাতালে আসতে বলেন। পরবর্তীতে ২৫ মে ভোরে তার প্রসববেদনা শুরু হয়। দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বিকেল সাড়ে ৫টায় তিনি স্বাভাবিকভাবে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি সম্ভাব্য তারিখের প্রায় ১৯ দিন আগেই হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার বেড়ে গেলেও অনেক মা এখনও স্বাভাবিক প্রসবকে অগ্রাধিকার দিতে চান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্ভব কি না, তা নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, বয়স, পূর্বের চিকিৎসা ইতিহাস, গর্ভের শিশুর অবস্থান এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজলের মতে, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রথমেই মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। একজন গর্ভবতী নারীকে বুঝতে হবে স্বাভাবিক প্রসব কী এবং এ প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনি কতটা প্রস্তুত। একইসঙ্গে পরিবারকেও যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ প্রয়োজন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে সিজারিয়ান অপারেশনও করতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, গর্ভাবস্থায় অযথা উদ্বেগ বা নেতিবাচক চিন্তা এড়িয়ে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা জরুরি। গান শোনা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শান্ত পরিবেশে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে মায়ের শারীরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত ওজন যেমন ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজনও জটিলতার কারণ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় খাদ্যতালিকায় তাজা ফলমূল, শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন, শর্করা, আয়রন এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। সঠিক পুষ্টি মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনাও বাড়াতে সাহায্য করে। হাঁটা ও ব্যায়ামের ভূমিকা জান্নাতুল মাওয়া জানান, তার তিনটি সন্তানই স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিয়েছে। প্রতিবারই চিকিৎসকরা তাকে পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়াম স্বাভাবিক প্রসবের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করে। এর মধ্যে স্কোয়াট, কেজেল ব্যায়াম, হিপ ওপেনিং এবং পেরিনিয়াল ম্যাসাজ উল্লেখযোগ্য। পেরিনিয়াল ম্যাসাজ কেন গুরুত্বপূর্ণ? পেরিনিয়াল ম্যাসাজ এমন একটি পদ্ধতি, যা প্রসবপথের পেশিগুলোকে নমনীয় করতে সহায়তা করে। এতে শরীরের নিম্নাংশের মাংসপেশি শিথিল হয় এবং স্বাভাবিক প্রসবের সময় চাপ কিছুটা কমতে পারে। অধ্যাপক কাজল বলেন, তলপেট ও পেলভিক অঞ্চলের পেশি এবং জয়েন্টগুলোকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করা জরুরি। কারণ, একটি নবজাতককে প্রসবপথ দিয়ে বের হওয়ার জন্য এসব অংশের যথেষ্ট প্রসারণ প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক সময় চিকিৎসকরা পেলভিক পেশির নমনীয়তা বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যায়ামের পরামর্শ দেন। আরও পড়ুন: স্ট্রোকের আগে শরীর যেসব সতর্ক সংকেত দেয় কাজিনকে বিয়ে করার আগে জানুন এই সত্য পিরিয়ডের রক্তেই মিলতে পারে লুকিয়ে থাকা নানা রোগের ইঙ্গিত প্রসব পরিকল্পনা আগে থেকেই করা প্রয়োজন চিকিৎসকদের মতে, শুধু মা নয়, পরিবারের সদস্যদেরও আগে থেকে একটি প্রসব পরিকল্পনা তৈরি রাখা উচিত। প্রসববেদনা শুরু হলে কোন হাসপাতালে যাওয়া হবে, কোন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা হবে, জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা কে হবেন, খরচের ব্যবস্থা কীভাবে হবে-এসব বিষয় আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা প্রয়োজন। অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই এমন হাসপাতাল নির্বাচন করা উচিত, যেখানে মা ও নবজাতকের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যদেরও প্রসববেদনার লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে, যেন সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়। নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান জরুরি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা বাড়াতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থা নিয়মিত মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় এবং যেকোনো জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। সব মিলিয়ে, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সুপরিকল্পিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম হবে, সে সিদ্ধান্ত অবশ্যই মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গ্রহণ করবেন। তথ্যসূত্র: বিবিসি জেএস/

Go to News Site