Collector
Giriş Yap
বাসযোগ্য ঢাকা: নগরায়ণের সংকট ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন | Collector
বাসযোগ্য ঢাকা: নগরায়ণের সংকট ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

বাসযোগ্য ঢাকা: নগরায়ণের সংকট ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

‘আজকাল আমার নিজেরই মনে হয় যে আমি ঢাকা শহরে থাকবো না, দেশের অন্য শহরে গিয়ে থাকবো। কারণটা হচ্ছে, এটা আর বাসযোগ্য মনে হয় না।’ রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গতকাল ৬ জুনের এই বক্তব্য নিছক কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যা প্রতিদিন কোটি নগরবাসী অনুভব করছেন। যে শহর একসময় ছিল সম্ভাবনার কেন্দ্র, কর্মসংস্থানের প্রাণকেন্দ্র এবং উন্নয়নের প্রতীক, সেই ঢাকাই আজ দূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, জনঘনত্ব ও নাগরিক সেবার সংকটে হাঁপিয়ে উঠছে। মির্জা ফখরুল আরও বলেছেন, ‘আপনি ঘর থেকে বের হলেই যে অক্সিজেন গ্রহণ করেন, সেটাও দূষিত।’ কথাটি আবেগের নয়, বাস্তবতার। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার বায়ুমান সূচক (AQI) পর্যবেক্ষণে প্রায়ই দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার নাম শীর্ষের দিকে অবস্থান করে। বাতাসে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা, নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বায়ুদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ঢাকার বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়ন নীতির ফল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি দ্রুত বেড়েছে নগরমুখী মানুষের সংখ্যা। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ প্রতিনিয়ত রাজধানীতে ছুটে এসেছে। ফলে যে শহর কয়েক লাখ মানুষের জন্য পরিকল্পিত ছিল, সেখানে এখন কয়েক কোটি মানুষের বসবাস। এই জনচাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো, সেবা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে নগরায়ণের সুফলের পাশাপাশি তার বিরূপ প্রভাবও ক্রমেই প্রকট হয়েছে। একদিকে বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার ও মেগাপ্রকল্পের বিস্তার; অন্যদিকে খেলার মাঠ, জলাধার, খাল ও উন্মুক্ত সবুজের সংকোচন—এই বৈপরীত্যই আজকের ঢাকার পরিচয়। বিশ্বের সফল নগরগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাসযোগ্য শহর কেবল উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়কের মাধ্যমে তৈরি হয় না। একটি শহরের বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার পরিবেশ, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর। অথচ ঢাকার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে অবকাঠামো নির্মাণের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করেছি। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে, নাগরিকরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছে, সেটি মূল্যায়ন করা দরকার। এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো নাগরিকের জীবনমানের উন্নতি। যদি বিপুল ব্যয়ের পরও একজন মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছাতে প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন, যদি শিশুদের খেলার জায়গা না থাকে, যদি বৃষ্টির পর নগর ডুবে যায়, তবে উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। এই শহরকে বাসযোগ্য রাখা কেবল একটি নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের প্রশ্ন। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে মানুষ রাজধানীতে বসবাসকে বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে সেটি শুধু একটি শহরের সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও সতর্কবার্তা। ঢাকার আরেকটি বড় সংকট হলো পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা। শহরের বহু খাল ভরাট হয়ে গেছে, জলাধার দখল হয়েছে, বৃক্ষনিধন বেড়েছে। নগরের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকগুলোতে তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা এবং বায়ুদূষণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যখাতেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্‌রোগ, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সঙ্গে নগর পরিবেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মির্জা ফখরুলের ভাষায়, ‘একটি সরকারি হাসপাতালে যান, সেখানে ঢোকাই যায় না।’ জনসংখ্যার চাপ এবং সেবার সীমাবদ্ধতা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একটি বাসযোগ্য শহরের অন্যতম শর্ত হলো সহজপ্রাপ্য ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা, যা এখনো ঢাকার বড় দুর্বলতা। তবে শুধু প্রশাসন বা সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। নগর সংকটের পেছনে নাগরিক আচরণ, সামাজিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারেরও ভূমিকা রয়েছে। আমরা অনেক সময় খাল দখল করি, ফুটপাত অবরুদ্ধ করি, বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলি, ট্রাফিক আইন মানি না। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে ওঠে। এখানেই মির্জা ফখরুলের আরেকটি মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, শুধু নাগরিকদের সচেতন করলেই হবে না; যারা নীতিনির্ধারণ করছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রকৃতপক্ষে একটি বাসযোগ্য শহর গঠনের জন্য নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—দুটিই অপরিহার্য। বিশ্বের বিভিন্ন শহর আমাদের সামনে কার্যকর উদাহরণ তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহর একসময় ভয়াবহ যানজট ও পরিবেশ দূষণের সমস্যায় ভুগছিল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নদী পুনরুদ্ধার, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সিঙ্গাপুর সীমিত ভূমি ও উচ্চ জনঘনত্ব সত্ত্বেও কঠোর পরিকল্পনা, সবুজায়ন এবং দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রেও সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, কেন্দ্রীয় উন্নয়ন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের অন্যান্য শহরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও প্রশাসনিক সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, নগর পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক মেয়াদের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। তৃতীয়ত, গণপরিবহনভিত্তিক নগর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর শহর কখনোই টেকসই হতে পারে না। চতুর্থত, খাল, জলাধার, উন্মুক্ত স্থান এবং সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশকে উন্নয়নের প্রতিপক্ষ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। পঞ্চমত, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর ও স্বশাসিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নাগরিক অংশগ্রহণ। শহর শুধু প্রশাসনের নয়; এটি নাগরিকদেরও। পরিকল্পনা, বাজেট, সেবা মূল্যায়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত না হলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। এই শহরকে বাসযোগ্য রাখা কেবল একটি নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের প্রশ্ন। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে মানুষ রাজধানীতে বসবাসকে বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে সেটি শুধু একটি শহরের সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও সতর্কবার্তা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য তাই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি এমন একটি ঢাকা চাই, যেখানে মানুষ কেবল জীবিকা নির্বাহ করবে, নাকি এমন একটি ঢাকা, যেখানে মানুষ সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কথায় নয়, নীতিতে, পরিকল্পনায় এবং বাস্তবায়নে দিতে হবে। কারণ একটি শহরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার ভবনের উচ্চতায় নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন কতটা মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ এবং স্বস্তিদায়ক—তার মাধ্যমে। ঢাকা যদি সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের বহু অর্জনও একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে। আর যদি আমরা এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে এই শহর আবারও হতে পারে সম্ভাবনা, মানবিকতা এবং টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

Go to News Site