Jagonews24
পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্বের আগমনে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের পর প্রথম কার্যদিবসে লেনদেনে উল্লম্ফন হওয়র পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। রোববার (৭ জুন) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দাম বাড়ার তালিকায় বেশি প্রতিষ্ঠান নাম লেখানোর পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে ডিএসইতে রেকর্ড লেনদেন হয়েছে। বাজারটিতে ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সবচেয়ে বড় লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নতুন ব্যক্তিদের আগমনকে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। যার প্রতিফল নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রথম কার্যদিবসেই দেখা গেল। প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া নতুন নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশারই প্রতিফলন। তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরে হয়েছে, তা ধরে রাখতে নতুন নেতৃত্বকে শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনতে হবে। আগের কমিশনের নানা পদক্ষেরপর কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বাজারকে গতিশীল করতে নতুন নেতৃত্বকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাপক সমালোচনা এবং সরকার থেকে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিলে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএসইসির চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও তার চার কমিশনার পদত্যাগ করেন। এরপর, ওইদিনই বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাসুদ খানকে নিয়োগ দেয় সরকার। সেই সঙ্গে তিন কমিশনার হিসেবে নারী আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ-আল-তারিককে নিয়োগ দেওয়া হয়। রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বৃহস্পতিবার দরপতন থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফেরে শেয়ারবাজার। ওইদিন শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষ হওয়ার পর বিএসইসি কার্যলয়ে গিয়ে দায়িত্ব বুঝে নেন নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার। এ হিসাবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে আজই শেয়ারবাজারে প্রথম লেনদেন হয়েছে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে, লেনদেনের শুরুতেই সূচকের বড় উত্থান হয়। তবে, লেনদেনের শেষদিকে বস্ত্র, খাদ্য ও প্রকৌশল খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে এক প্রকার ঢালাও দরপতন হয়। তবে, বিমা খাতের কোম্পানিগুলো দাম বাড়ার ক্ষেত্রে বড় দাপট দেখায়। সেই সঙ্গে অন্যান্য খাতেও দাম বাড়ার সংখ্যা বেশি হয়। ফলে, মূল্যসূচক বেড়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৮৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৬০টির এবং ৪৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর বিমা খাতের ৪৯টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫টির এবং একটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, বস্ত্র খাতের ১৪টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে ৩৫টির এবং ৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। খাদ্য খাতের ৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ১৫টির দাম কমেছে। এছাড়া, প্রকৌশল খাতের ১০টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ২৭টির দাম কমেছে। এদিকে, ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১২০টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৫৪টির দাম কমেছে এবং ২৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ২১টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫১টির এবং ৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪২টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫৫টির এবং ২৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর, তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৫টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৪টির দাম কমেছে এবং ১৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫১৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১১৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর, বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৮ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৮৭ পয়েন্টে উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে টানা নয় কার্যদিবস মূল্যসূচক বাড়লো। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫২৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ১৭৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হলো। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ২ হাজার ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়। এরপর আজকের আগে ডিএসইতে আর ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লেনদেনের দেখা মেলেনি। এই লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের শেয়ার। কোম্পানিটির ৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আইপিডিসি ফাইন্যান্সের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকার। ২১ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে জেনেক্স ইনফোসিস। এছাড়া, ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, জিকিউ বলপেন, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, নাভানা ফার্মা, মীর আখতার হোসেন লিমিটেড, লাভেলো আইসক্রিম এবং অগ্নি সিস্টেম। অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ১৩১ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৩টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৮০টির এবং ৩০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৫৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা বলেন, বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে ইতিবাচক ভূমিকরা রাখবে -বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যার ফলে সাইডলাইনে থাকা অনেকেই শেয়ারবাজারে সক্রিয় হয়েছে। এতে লেনদেনের গতি বেড়েছে। এখন নতুন নেতৃত্বকে দ্রুত বাজার উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে, তা না হলে আবার দরপতন ফিরে আসতে পারে। ডিএসইর এক সদস্য বলেন, আগের কমিশনের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি উঠে গিয়েছিল। যে কারণে অর্থমন্ত্রী বিএসইসিতে পরিবর্তনের আভাস দেওয়ার পর থেকেই বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। আর নতুন নেতৃত্বের অধীনে প্রথম কার্যদিবসেই দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হওয়া খুবই ইতিবাচক। তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্বের প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার প্রতিফল এই লেনদেন। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। বাজারের প্রতি যে ইতিবাচাক মনোভাস তৈরি হয়েছে তা ধরে রাখতে কমিশনকে দ্রুত নীতিগত সংস্কার করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বাজারে কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্বল কোম্পানির আসার পথ বন্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বড় অঙ্কের লেনদেন হলেও আজ (রোববার) শেষদিকে বিক্রির চাপ ছিল যথেষ্ট। ফলে, শুরুতে দাম বাড়লেও লেনদেনের শেষদিকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। টানা কয়েক কার্যদিবস দাম বাড়ার কারণে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার কারণেও এটা হতে পারে। এখন আগামী কয়েক কার্যদিবস বড় লেনদেন এবং বাজার ইতিবাচক ধারায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। এমএএস/এএমএ
Go to News Site