Collector
Giriş Yap
ভাঙতি নেই: অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবনের এক নীরব সংকট | Collector
ভাঙতি নেই: অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবনের এক নীরব সংকট

ভাঙতি নেই: অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবনের এক নীরব সংকট

বাসে উঠলেই চোখে পড়ে একটি ছোট্ট নোটিশ—“৫০০ ও ১০০০ টাকার ভাঙতি নেই।” কোনো মনোহারি দোকান, ফার্মেসি কিংবা চায়ের দোকানেও একই দৃশ্য। ক্রেতা এক প্যাকেট বিস্কুট কিনতে এসে এক হাজার টাকার নোট বাড়িয়ে দিলে দোকানদার বিরক্ত মুখে বলেন, “ভাঙতি নেই।” এরপর শুরু হয় অস্বস্তিকর বাক্যালাপ। কেউ রাগ করেন, কেউ বিব্রত হন, কেউ আবার পণ্য ফেরত রেখে চলে যান। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। কিন্তু এই ছোট্ট বাক্য—“ভাঙতি নেই”—শুধু বাজারের লেনদেনের সমস্যা নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক, মানবিকতা এবং ব্যক্তিজীবনের এক গভীর বাস্তবতার প্রতীকও বটে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অর্থের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু অর্থের ব্যবহারিক মূল্য কমেছে। এক সময় যে একশ টাকার নোট হাতে পেলে একজন মানুষ সপ্তাহের বাজার করার সাহস পেতেন, আজ সেই নোট অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার খরচও বহন করতে পারে না। মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে অর্থের অঙ্ক বড় হয়েছে, কিন্তু অর্থের শক্তি ছোট হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মানুষের হাতে বড় নোটের উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু ছোট নোটের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি মুদ্রা ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তব সমস্যা। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এর ভেতরে আরও বড় একটি গল্প লুকিয়ে আছে। আমাদের জীবনেও যেন আজ সর্বত্র “ভাঙতি নেই” লেখা ঝুলছে। মানুষের কাছে অর্থ আছে, কিন্তু সময় নেই। পরিচিতি আছে, কিন্তু সম্পর্ক নেই। যোগাযোগ আছে, কিন্তু সংযোগ নেই। হাজার হাজার বন্ধু আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কিন্তু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ নেই। আমরা বড় বড় নোট নিয়ে জীবনযাপন করছি, অথচ ছোট ছোট মানবিক মুদ্রাগুলো হারিয়ে ফেলছি। এক সময় গ্রামের বাড়িতে অতিথি এলে খালি হাতে ফিরতে হতো না। ঘরে যা আছে তাই ভাগাভাগি করে খাওয়ানোর এক সংস্কৃতি ছিল। এখন অনেক বাড়িতে ফ্রিজ ভরা খাবার থাকে, কিন্তু অতিথির জন্য সময় থাকে না। এক সময় মানুষ প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের খবর জানত। এখন একই ফ্ল্যাটে বছরের পর বছর বসবাস করেও পাশের দরজার মানুষের নাম জানা হয় না। অর্থনীতিতে ভাঙতি না থাকলে যেমন লেনদেন ব্যাহত হয়, তেমনি জীবনে সহমর্মিতা না থাকলে মানবিক সম্পর্কও অচল হয়ে পড়ে। আমাদের জীবনেও যেন আজ সর্বত্র “ভাঙতি নেই” লেখা ঝুলছে। মানুষের কাছে অর্থ আছে, কিন্তু সময় নেই। পরিচিতি আছে, কিন্তু সম্পর্ক নেই। যোগাযোগ আছে, কিন্তু সংযোগ নেই। হাজার হাজার বন্ধু আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কিন্তু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ নেই। আমরা বড় বড় নোট নিয়ে জীবনযাপন করছি, অথচ ছোট ছোট মানবিক মুদ্রাগুলো হারিয়ে ফেলছি। বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, আধুনিক সমাজে সামাজিক পুঁজি বা social capital কমে গেলে মানুষের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ একা হয়ে পড়ে, সমাজে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। বাংলাদেশের নগর জীবনেও সেই লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বহুতল ভবন বাড়ছে, কিন্তু প্রতিবেশী সম্পর্ক কমছে। মানুষের আয় বাড়ছে, কিন্তু মানসিক প্রশান্তি বাড়ছে না। “ভাঙতি নেই” কথাটির আরেকটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পাঠও আছে। আমাদের অর্থনীতিতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের গল্প আছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির গল্প আছে, বৈদেশিক বাণিজ্যের গল্প আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই উন্নয়নের ভাঙতি কি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে? উন্নয়নের বড় নোট কি সমাজের প্রতিটি স্তরে খুচরা সুবিধা হিসেবে বণ্টিত হচ্ছে? একজন রিকশাচালক, একজন কৃষক, একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী কিংবা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক যদি তার দৈনন্দিন জীবনে উন্নতির ছোঁয়া অনুভব না করেন, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির বড় অঙ্কগুলো অনেক সময় কাগুজে হিসাবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন তার ভাঙতি মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। যখন উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যানে নয়, রান্নাঘরে, স্কুলে, হাসপাতালে এবং মানুষের মুখের হাসিতে দৃশ্যমান হয়। আজকের তরুণ প্রজন্মের জীবনেও “ভাঙতি নেই” একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাদের ডিগ্রি আছে, দক্ষতা আছে, স্বপ্ন আছে; কিন্তু সুযোগের ভাঙতি নেই। অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বছরের পর বছর কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকেন। কেউ কেউ বিদেশমুখী হন, কেউ হতাশায় ভোগেন। তাদের জীবনের বড় স্বপ্নগুলো বাস্তবতার ছোট ছোট সুযোগে রূপান্তরিত হতে পারে না। আবার পারিবারিক সম্পর্কেও একই দৃশ্য। বাবা-মা সন্তানদের জন্য সারা জীবন ত্যাগ স্বীকার করেন। বার্ধক্যে এসে তাদের প্রয়োজন হয় খুব বেশি কিছু নয়—একটু সময়, একটু কথা, একটু খোঁজখবর। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় সেই সামান্য ভাঙতিটুকুও যেন অনুপস্থিত। ফলে অনেক প্রবীণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হলেও মানসিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। আমরা এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে বড় বড় অর্জনের গল্প শোনা যায়, কিন্তু ছোট ছোট মানবিকতার গল্প ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছে। অথচ সভ্যতা টিকে থাকে বড় নোটে নয়, ভাঙতিতে। একজন চিকিৎসকের একটি আশ্বস্ত করা বাক্য, একজন শিক্ষকের একটি উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য, একজন বন্ধুর একটি ফোনকল, একজন সন্তানের কয়েক মিনিট সময়—এসবের আর্থিক মূল্য হয়তো নেই, কিন্তু মানবিক মূল্য অপরিসীম। জাপানে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—সমাজকে শক্তিশালী করে দৈনন্দিন ছোট ছোট সৌজন্য। কেউ দরজা খুলে ধরল, কেউ ধন্যবাদ দিল, কেউ পথ দেখিয়ে দিল—এসব ক্ষুদ্র আচরণ সামাজিক আস্থা তৈরি করে। উন্নত দেশগুলোর সামাজিক স্থিতিশীলতার পেছনে এমন অসংখ্য অদৃশ্য “ভাঙতি” কাজ করে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতির প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের বড় নীতির পাশাপাশি ছোট মানবিক উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ছোট মুদ্রার সহজলভ্যতা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক জীবনে সহমর্মিতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রবাহও জরুরি। উন্নয়নের সুফলকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, নগর জীবনে সামাজিক বন্ধন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু আয় দিয়ে বাঁচে না; মানুষ বাঁচে সম্পর্ক দিয়ে, স্মৃতি দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে। বাসের ভেতরে লেখা সেই ছোট্ট বাক্যটি—“ভাঙতি নেই”—প্রতিদিন আমাদের চোখে পড়ে। আমরা হয়তো সেটিকে কেবল লেনদেনের একটি সমস্যা বলে ভাবি। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এটি আমাদের সময়ের এক নীরব রূপক। আমাদের অর্থনীতিতে ভাঙতি কমে যাচ্ছে, আমাদের সমাজেও ভাঙতি কমে যাচ্ছে, আমাদের জীবনেও ভাঙতি কমে যাচ্ছে। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরও অর্থ নয়, আরও মানবিক ভাঙতি। এমন কিছু ছোট ছোট মূল্যবোধ, যা বড় বড় সংকটকে সহজ করে দেয়। এমন কিছু ছোট ছোট সম্পর্ক, যা একাকীত্বের অন্ধকার ভেঙে আলো জ্বালায়। এমন কিছু ছোট ছোট দায়িত্ব, যা একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখে। কারণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলো কখনো হাজার টাকার নোটের মতো বড় নয়। সেগুলো অনেক সময় একমুঠো খুচরা মুদ্রার মতোই ছোট—কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তার মূল্য অসীম। আর সেই কারণেই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে গভীর সামাজিক বিজ্ঞপ্তিটি কোনো বাসের গায়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে লেখা আছে—“ভাঙতি নেই।” প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার সেই ভাঙতি ফিরিয়ে আনতে পারব? লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com এইচআর/জেআইএম

Go to News Site