Collector
Giriş Yap
১৬ নদীর ঘূর্ণিপাকে ১০ লাখ জীবন, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি কুড়িগ্রামের মানুষের | Collector
১৬ নদীর ঘূর্ণিপাকে ১০ লাখ জীবন, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি কুড়িগ্রামের মানুষের

১৬ নদীর ঘূর্ণিপাকে ১০ লাখ জীবন, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি কুড়িগ্রামের মানুষের

আসন্ন জাতীয় বাজেটে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর ভাঙনরোধ ও চরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক সমাজ ও জনপ্রতিনিধিরা। প্রতিবছর ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের তীব্র ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। ভুক্তভোগীদের মতে, অস্থায়ী প্রতিরোধ নয়, বরং স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধ করা গেলে নদীপাড় ও চরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন সম্ভব। অন্যদিকে জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্থায়ী সংকটে রেখে দেশের সার্বিক ও সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন সচেতন মহল।সরেজমিনে প্রতি বছর দেখা যায়, বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই নদ-নদীর তীব্র ভাঙনে ভিটেমাটি ও আবাদী জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে অসংখ্য পরিবার। বন্যার সময় গৃহপালিত পশুসহ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রাণপন লড়াই করতে হয় তাদের। আবার শুষ্ক মৌসুমে খরায় কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় দেখা দেয় তীব্র টান। বন্যা, খরা আর নদীভাঙনের এই ত্রিমুখী ঘূর্ণিপাকেই কাটছে নদীপাড় ও চরাঞ্চলের মানুষের জীবন।নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, নদ-নদী এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখার প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও কুড়িগ্রাম জেলায় তা যেন এক চরম দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর প্রধান চারটি নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নতুন জেগে ওঠা চরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় হাজার হাজার পরিবার। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই চরটিও আবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে তাদের পুনরায় অন্য চরে বসত গড়তে হয়। বার বার ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ, ভাঙন শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অস্থায়ী ভিত্তিতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে তা রোধের চেষ্টা করে। কিন্তু পরের বছর বন্যার প্রবল স্রোতে তা ভেসে যায় এবং আবারও একই নিয়তি বরণ করতে হয়। এজন্য এবারের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে নদ-নদীর তীর রক্ষায় স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলেছেন তারা।সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুধকুমার পাড়ের বাসিন্দা লেবু মিয়া বলেন, 'গত বছর বর্ষায় যাত্রাপুরের বানিয়াপাড়ায় নদী ভাঙনে প্রায় ২শ টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এবারও নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা নদী পাড়ের মানুষরা বার বার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। তাই এবারে নতুন সরকারের বাজেটে যেন ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়।'স্বাধীনতার পর থেকে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর ভাঙনরোধে কোনো স্থায়ী সমাধান না করায় জেলাটি দেশের অন্যতম দরিদ্রতম জেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নদীশাসন এবং একই সাথে চরের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মানোন্নয়নে কাজ করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।কুড়িগ্রামে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি খন্দকার খায়রুল আনম বলেন, 'জাতীয় বাজেটে সমবণ্টনের পাশাপাশি কুড়িগ্রামের নদ-নদীগুলোর ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধানের জন্য বিশেষ নজর দিতে হবে। চরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে এই জেলার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।'আরও পড়ুন: কেমন হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট?কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, 'কুড়িগ্রাম জেলার উপর দিয়ে ১৬টি নদ-নদী প্রবাহিত। প্রতি বছর এসব নদ-নদীর ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। নদী ভাঙন রোধ এবং চরের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের উন্নয়ন করা না গেলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তাই এসব বিশেষ এলাকার টেকসই উন্নয়নের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনসহ বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।'কুড়িগ্রামসহ সারাদেশে নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় বিশেষ বাজেট বরাদ্দের পক্ষে মত দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যও। কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, 'দেশে নদ-নদীর ভাঙনরোধে বর্তমানে বাজেটে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা পর্যাপ্ত নয়। এই বরাদ্দ অন্তত দুই থেকে তিন গুণ বাড়ানো উচিত। যাতে করে শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারাদেশের মানুষ নদী ভাঙনের স্থায়ী অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।'কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান ভাঙনের তীব্রতার কথা স্বীকার করে জানান, প্রতি বছর বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পয়েন্টে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। তবে এসব নদ-নদীর তীর রক্ষায় যদি দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী কাজ করা যায়, তবে ভাঙন ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা সম্ভব।উল্লেখ্য, জেলার ৯টি উপজেলায় জালের মতো বিস্তার করে আছে প্রধান ৪টিসহ মোট ১৬টি নদ-নদী। এই নদীগুলোর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সাড়ে ৪ শতাধিক চরাঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ এবং নদীপাড়ের অববাহিকায় আরও ১০ লাখের বেশি মানুষ চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। আসন্ন বাজেটে সরকার কুড়িগ্রামের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাণের দাবিকে মূল্যায়ন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা জেলাবাসীর।

Go to News Site