Jagonews24
গ্রীষ্মের খরতাপ মানেই বাঙালির কাছে অদ্ভুত অপেক্ষার অবসান। এই অপেক্ষার কেন্দ্রে থাকে রসালো ফল আম। বাংলা সাহিত্যে আম কেবল একটি ফল নয়। এটি বাঙালির শৈশব, নস্টালজিয়া এবং গ্রামীণ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহিত্যের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আমের মুকুল থেকে শুরু করে পাকা আম পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই লেখকদের কলমে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। লোকজ ছড়া ও কবিতায় শৈশবের স্মৃতি বাঙালির শৈশব শুরু হয় ‘আম পাতা জোড়া জোড়া’ ছড়ার মধ্য দিয়ে। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবিতায় আমরা পাই কালবৈশাখীর চিরচেনা রূপ। তার লেখা ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ’ পঙ্ক্তিটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির শৈশবের মধুর স্মৃতি হয়ে আছে। আবার সুকুমার রায়ের ‘আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে’ কবিতায় আম এসেছে গ্রামীণ জীবনের নিখাদ আনন্দের প্রতীক হয়ে। বর্তমান প্রজন্মের চার দেওয়ালে বন্দি জীবনের সাথে তুলনা করলে শৈশবের সেই আম কুড়ানোর আনন্দ আজ যেন রূপকথার মতো শোনায়। প্রকৃতির বন্দনা ও আমের মুকুলের সুবাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় আমের মুকুলের সুবাস বারবার উঠে এসেছে। আমাদের জাতীয় সংগীতেও রয়েছে ‘ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে’ চরণটি। শীতের শেষে গাছে গাছে মুকুল আসার যে চমৎকার উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে, তা সাহিত্যে বসন্তের আগমনী বার্তা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। মুকুলের মিষ্টি গন্ধ যেন এক লহমায় প্রকৃতির রুক্ষতা দূর করে দেয়। আরও পড়ুনপুণ্ড্রনগরের প্রবাদ-প্রবচন এবং লৌকিক ছড়া: শেষ পর্ব ধ্রুপদী সাহিত্যে গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে অপু ও দুর্গার শৈশব বর্ণনায় আমের উপস্থিতি অনবদ্য। কালবৈশাখীতে আমের গুঁটি ঝরে পড়া এবং ভাই-বোন মিলে লুকিয়ে কাঁচা আম চুরি করে মাখানো খাওয়ার যে চিত্র সেখানে ফুটে উঠেছে, তা বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ জীবনযাত্রার জীবন্ত দলিল। কাঁচা আমের টক স্বাদ যেন তাদের দুরন্তপনারই আরেক রূপ। শিশুতোষ গল্প ও রহস্য উপন্যাসে আমবাগান বাংলা সাহিত্যের শিশুতোষ গল্প এবং থ্রিলার উপন্যাসে আমবাগান দারুণ পটভূমি তৈরি করে। রাতের বেলা বিশাল আমবাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার গা ছমছমে পরিবেশ পাঠকদের সব সময়ই রোমাঞ্চিত করে। কিশোর গোয়েন্দাদের অ্যাডভেঞ্চারে প্রায়ই দেখা যায়, পুরোনো জমিদার বাড়ির পেছনের আমবাগানে লুকিয়ে থাকা কোনো রহস্য তারা ভেদ করছেন। ছায়ায় ঘেরা নির্জন আমবাগান তাই রহস্য ও থ্রিলার গল্পের আদর্শ ক্যানভাস। জীবনদর্শন ও ঋতুচক্রের রূপক সাহিত্যিকরা অনেক সময় আমগাছ ও এর ফলনচক্রকে মানবজীবনের রূপক হিসেবেও ব্যবহার করেছেন। গাছে মুকুল আসা, গুঁটি ধরা এবং অবশেষে সেটি একটি পরিপূর্ণ রসালো আমে রূপান্তরিত হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি মানবজীবনের বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার সাথে দারুণভাবে মেলানো হয়েছে। আরও পড়ুনসৃজনশীলতায় কোনো লিঙ্গভেদ নেই: রুমা মোদক বাংলা সাহিত্যে আমের এই বহুমুখী উপস্থিতি প্রমাণ করে, এটি কেবল আমাদের রসনা তৃপ্ত করে না। একইসাথে আমাদের মনন, স্মৃতি এবং কল্পনাকেও সমৃদ্ধ করে। এসইউ
Go to News Site