Jagonews24
ভ্রমণের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। এটি মানুষকে শুধু এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যায় না, বরং তার ভেতরের মানুষটিকেও নতুন করে আবিষ্কার করতে শেখায়। সেই আবিষ্কারের আশাতেই আমেরিকায় বেড়াতে এসে একদিন লেক মিশিগানের তীরে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। তারিখ ৭ জুন। গ্রীষ্মের দিন। আমেরিকার ইন্ডিয়ানার আকাশে তখন সামারের দীর্ঘ বিকেল। বাংলাদেশে এ সময়ে সন্ধ্যার আভাস নেমে আসে, কিন্তু এখানে সূর্য যেন দিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায় না। বিকেল সাড়ে তিনটায় আমরা ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে রওয়ানা দিলাম ইন্ডিয়ানা ডিউনসের উদ্দেশ্যে। আমাদের দলটি ছিল ছোটখাটো এক ভ্রমণ-কারাভান। মোট আঠারোজনের প্রাণবন্ত দল। সবাই তরুণ গবেষক, স্বপ্নবাজ মানুষ; অধিকাংশই পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। আমাদের পরিবারে ছিল সাতজন সদস্য। সুদীপ্তর গাড়িতে পাঁচজন। স্টিয়ারিংয়ে স্নেহের সুদীপ্ত, যার মুখে সব সময়ই এক ধরনের স্থির হাসি লেগে থাকে; মনে হয় পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে খুব সহজে বিচলিত করতে পারে না। তার পাশে আমি। পেছনের আসনে বসেছে আমার নাতনি বাঁশরী, তার পাশে আমার মেয়ে এবং তার শাশুড়ি। সাজ্জাদুল বারীর গাড়িতে ছিল আমার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে। আরও দুটি গাড়িতে ছিলেন ফয়সাল, আকাশ এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। ভ্রমণের শুরু থেকেই সবার মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ, যা পথকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। ওয়েস্ট লাফায়েত শহর পেছনে ফেলে আমরা যখন ইন্টারস্টেটে উঠলাম; তখন রাস্তার দুপাশে খুলে গেল ইন্ডিয়ানার বিখ্যাত কৃষিভূমির অনন্ত বিস্তার। যতদূর চোখ যায় সবুজ ভুট্টাক্ষেত। সেই সবুজের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা লাল রঙের খামারবাড়িগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেউ বিশাল প্রান্তরের বুকে খেলনার ঘর সাজিয়ে রেখেছে। দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য উইন্ডমিলের সাদা পাখা ধীর ছন্দে ঘুরছিল, যেন প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এক নীরব সহাবস্থানের প্রতীক। সবুজ মাঠ আর সারিবদ্ধ উইন্ডমিলের দৃশ্য গ্রামীণ আমেরিকার সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। আমেরিকার রাস্তার একটি বিষয় আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে। এখানে রাস্তা যেন শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়, যাত্রাকে উপভোগ্য করে তোলার জন্যও নির্মিত হয়েছে। গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছুটে চলে, অথচ কোথাও অস্থিরতা নেই, হর্নের কর্কশ শব্দ নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই। পুরো পথজুড়ে এক ধরনের নীরব শৃঙ্খলা বিরাজ করে, যা নিজেই যেন সভ্যতার এক অনুচ্চারিত গল্প বলে। জানালার বাইরে বদলে যেতে থাকা দৃশ্যপট দেখতে দেখতে কখন যে দুই ঘণ্টার পথ শেষ হয়ে এলো, তা টেরই পেলাম না। গন্তব্যে পৌঁছে একে একে অন্য গাড়িগুলোও পার্কিং এলাকায় এসে থামল। মুহূর্তের মধ্যেই আঠারোজনের পুরো দল আবার একত্র হলো। মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধান, অথচ সবাইকে দেখে মনে হলো বহুদিন পর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। হাসি, আড্ডা আর কুশল বিনিময়ে চারপাশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। পার্কিং এলাকা থেকে একটু এগোতেই চোখের সামনে উন্মোচিত হলো লেক মিশিগানের অপরিসীম নীল জলরাশি। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, আকাশ যেন নেমে এসে জলের বুকে আশ্রয় নিয়েছে। দূরে জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট লাল-সাদা লাইটহাউজটি যেন সময়ের এক শান্ত প্রহরী। লাইটহাউজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা উপভোগ করছিলাম শীতল বাতাস আর চারপাশের অপার সৌন্দর্য। বাঁশরী স্ট্রলারে বসে বিস্মিত চোখে সবকিছু দেখছিল, আর সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল ছবি তোলা ও সেলফিতে। আমি কিছুক্ষণ ক্যামেরা ভুলে শুধু প্রকৃতিকে দেখলাম। দূরে উড়ে চলা সিগাল, পথের পাশে বসে বরশিতে মাছ ধরা মানুষ আর দিগন্তজোড়া জলরাশি মিলিয়ে দৃশ্যটি যেন কোনো শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ছবি। লাইটহাউজের কাছে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এই জল, আকাশ আর বাতাস যুগের পর যুগ একই রকম আছে; আমরা শুধু ক্ষণিকের পথিক। সেই সৌন্দর্যে কিছুক্ষণ ডুবে থাকার পর আবার অন্য স্পটে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠলাম। সামনে অপেক্ষা করছিল ইন্ডিয়ানা ডিউনস স্টেট পার্কের বিস্তীর্ণ সৈকত, যেখানে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের আরেকটি অধ্যায় মেলে ধরতে প্রস্তুত। ইন্ডিয়ানা ডিউনস স্টেট পার্কে পৌঁছেই মনে হলো আমরা যেন এক বিশাল নীল ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে অসীম জলরাশি। দিগন্তে আকাশ আর জলের সীমারেখা কোথায় মিলিয়ে গেছে, তা বোঝার উপায় নেই। দূর থেকে মনে হয়, পৃথিবী যেন এখানেই এসে শেষ হয়েছে। ঢেউগুলো সমুদ্রের মতো উন্মত্ত নয়, আবার পুরোপুরি শান্তও নয়। তাদের চলাফেরার মধ্যে এক ধরনের সংযত সৌন্দর্য আছে, যেন কোনো ভদ্রলোক নিঃশব্দে হাসছেন। এই ডিউনসের ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। হাজার হাজার বছর আগে বরফযুগের বিশাল হিমবাহ গলে যে বালি, পলি ও পাথর রেখে গিয়েছিল, প্রকৃতি তার ধৈর্য ও সময়ের তুলিতে সেগুলোকে রূপ দিয়েছে আজকের এই বালিয়াড়িতে। কোথাও ছোট পাহাড়ের মতো উঁচু বালুর স্তূপ, কোথাও বাতাসে দুলতে থাকা ঘাস, কোথাও বুনো ফুলের রঙিন ছোঁয়া। তখন সত্যিই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পীর নাম প্রকৃতি। এই বিস্তৃত নীল আর সোনালি রঙের মেলবন্ধন মানুষের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করায়, আবার একই সঙ্গে তাকে প্রকৃতির বিশালতার সঙ্গে একাত্মও করে তোলে। সৈকতে পৌঁছে আমাদের দল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল। নরম বালুর ওপর পাটি বিছিয়ে শুরু হলো ছোট্ট বনভোজন। ঘর থেকে আনা নানা খাবারের প্যাকেট খুলতেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল পরিচিত বাঙালি ঘরোয়া উষ্ণতা। হাজার মাইল দূরের আমেরিকান সৈকতে বসেও মনে হচ্ছিল, আমরা যেন বাংলাদেশের কোনো নদীর চরে পিকনিকে এসেছি। গল্প, হাসি, খুনসুটি আর খাবারের স্বাদ মিলেমিশে অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করল। খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই ছুটে গেল জলের কাছে। লেক মিশিগানের শীতল জল পায়ে স্পর্শ করতেই অদ্ভুত সতেজতা অনুভব করলাম। কেউ জলে নেমে হাঁটছে, কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছে, কেউ ছবি তুলছে। ছোট্ট বাঁশরী আর আরওয়া তখন বালুর রাজ্যে নিজেদের পৃথিবী গড়তে ব্যস্ত। কখনো বালির দুর্গ, কখনো ছোট্ট পাহাড়, কখনো আবার অদ্ভুত সব নকশা। তাদের হাসি আর বিস্ময়ে ভরা চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দগুলো আসলে কত সহজ, কত স্বাভাবিক। শিশুরা যে আনন্দে মেতে ছিল, তা যেন আমাদের বড়দের মনেও নতুন প্রাণের সঞ্চার করছিল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। নীল জলরাশি সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরে সাদা ডানার সিগাল পাখিগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। দলের সবাই স্মৃতিকে ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছবির ফ্রেমে। কেউ একক ছবি তুলছে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার পুরো দলের গ্রুপ ছবি। কিন্তু আমি বারবার ক্যামেরা নামিয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখছিলাম। কারণ কিছু সৌন্দর্য আছে, যা ছবিতে ধরা পড়ে না; তা শুধু অনুভব করা যায়। বিকেলের শেষ আলো যখন বালুর ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে যাচ্ছিল; তখন হঠাৎ মনে হলো এই মুহূর্তগুলোই হয়তো ভ্রমণের প্রকৃত প্রাপ্তি। কোনো দর্শনীয় স্থান নয়, কোনো বিখ্যাত স্থাপনা নয়; বরং প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো এমন কিছু সময়, যা একদিন স্মৃতির ভাঁজে জমে থাকবে। সামনে অসীম জলরাশি, পায়ের নিচে নরম বালি, চারপাশে আপনজনের হাসি আর মাথার ওপর সীমাহীন আকাশ। জীবনের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? সন্ধ্যার রং ধীরে ধীরে আকাশে মিশে যাচ্ছিল। আমরা গুছিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, কিন্তু মন যেন থেকে যেতে চাইছিল সেই বালুকাবেলায়। ইন্ডিয়ানা ডিউনস তখন আমার কাছে আর শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়; এটি হয়ে উঠেছিল এক টুকরো আনন্দ, এক টুকরো বন্ধুত্ব, এক টুকরো পারিবারিক উষ্ণতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর মিলনের অনন্য স্মৃতি। সেই বিকেলের স্মৃতি হয়তো বহুদিন মনে করিয়ে দেবে, ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য মানুষ, প্রকৃতি ও মুহূর্তের মিলিত অনুভূতিতে। আরও পড়ুনলাফায়েতে স্ট্রবেরি পিকিং: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পর্যটনের অনন্য অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: এক বিকেল, এক শহর, এক ইতিহাসআমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশের ছোঁয়া: জর্জিয়ার এক সবুজ সকালআটলান্টিকের ঢেউয়ে ভেসে থাকা এক স্মরণীয় বিকেল এসইউ
Go to News Site