Jagonews24
আনিফ রুবেদ আমরা আমাদের নিয়ে ভাবি; মহাবিশ্বের অন্য সবকিছু নিয়ে ভাবি; সবকিছুর সাথে সবকিছুর কী সম্পর্ক সেসব নিয়ে ভাবি। এসব ভাবি মূলত মানুষকেই ব্যাখ্যা করার জন্য; নিজের জন্য একটা সংজ্ঞা দাঁড় করার জন্য। মানুষকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞান, ধর্ম আর দর্শন, গণিত আর জ্যামিতি, শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম কাজ করে। এবং কাজ করে চলেছে ক্লান্তিহীন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কিন্তু এসব অর্থাৎ মহাজগৎ ও মানুষ নিয়ে ভাবতে গেলে, হিসেব কষতে গেলে এত বড় বড় সংখ্যার মুখোমুখি হতে হয় যে, এতবড় সংখ্যাকে অর্থহীন মনে হয় অথবা শূন্য মনে হয়। পড়ছিলাম কবি তাসনুভা অরিনের কবিতার বই ‘ট্রাপিজিয়াম মানুষের আয়নারা’। তিনি কবিতার ভেতরে জ্যামিতির রেখা বা রেখার নির্যাস ব্যবহার করে মানুষকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বিরাট ক্যানভাসে। এ ক্যানভাস বিরাট মহাবিশ্বের সমান; এ ক্যানভাস মানুষের হৃদয়ের মতো অসীম আর অব্যাখ্যায় প্রায়।যদিও ট্রাপিজিয়ামের সাথে মানুষকে তিনি উপমিত করেছেন এবং বলেছেন, ‘প্রকৃতি নিয়মিত এবং অনিয়মিত, মুক্ত এবং বদ্ধ—বিপরীতে সাজানো। মানুষও তাই।’আমারও তাই মনে হয়; মানুষকে কাঠামোবদ্ধ করা সম্ভব নয়। জ্যামিতির জ্যোতি বা গণিতের গতি কোনোটা দিয়েই সম্পূর্ণাঙ্গভাবে কাঠামো বন্দি করা যায় না; খণ্ড খণ্ডভাবে করা যেতে পারে। ফলে মানুষ, ‘আয়ত, বর্গ, সামান্তরিক’ হতে পারে না; হতে পারে, ‘ট্রাপিজিয়াম’—কবি এমনটাই বলছেন।আমি হলে হয়তো এমনটাও বলতাম না, কারণ ট্রাপিজিয়ামও বোধগম্য একটা নীতিতে চলে বা স্থির থাকে। ‘ট্রাপিজিয়াম মানুষের আয়নারা’ বইতে আয়না মানে কবিতা। এবার আমরা আয়নাতে কবির এবং আমাদের রুপাবলি দেখে নিতে পারি। কবিতার বইটি বেশ কয়েকটি পর্বে বিভক্ত। এগুলো হলো, ‘ট্রাপিজিয়াম মানুষ’; ‘আমি ঠিক মানুষ না, ছায়া দিয়ে তৈরি ধুতুরার রং’; ‘কিছুটা পানি পানির সাথে মিশবে না বলে পাতায় করে যাচ্ছিল’; ‘তাসের ঘর ভাঙার সময় আওয়াজ হয় না’; ‘মগজের ভেতর গোরস্থান’; ‘পারদের প্রলেপ ঘন হলে আয়নার মুখস্থ বিদ্যা বেড়ে যায়’; ‘আপেল কাটার ছুরি দিয়ে মানুষ কেটো না’; ‘রাত্রি আসে প্রেতাত্মার পোশাক পরে’; ‘আমি বনফুল হারিয়ে ফেলেছি রক্তকরবীর মোহে’; ‘প্রিয় মানুষের প্রতিধ্বনি ছাড়া আমি কে’। এসব পর্বের নামগুলো খুব চমৎকার এবং মগজের কাগজে দাগ কাটে। আমাদের কল্পনার কলি যদি ফুল হয়ে ফোটে। তবে ফল পাওয়া যায়; বিফল পাওয়া গেলেও সমস্যা নেই। কিন্তু কলির ফোটা চাই। তাসনুভা অরিনের কল্পনা যখন আমাদের দেখিয়ে দেয় ত্রিভুজ ভেঙে বৃত্ত ভেঙে কিভাবে সরলরেখা তৈরি হয়; তখন আমাদের ভেতর জ্যামিতি জীবন্ত হয়ে ওঠে; রেখার নড়াচড়া টের পাই হৃদয়ের ভেতর।সরলরেখাত্রিভুজ ভেঙে গেলে সরলরেখাবৃত্ত ভেঙে গেলে সরলরেখা।(বৃত্তান্ত) কিন্তু আমাদের পৃথিবী এমনই যে, এখানে সরলরেখা বলে কোনো রেখা নেই। ফলে আমাদের হৃদয়ও বাঁকা অথবা ট্রাপিজিয়াম অথবা অন্যকিছু হয়ে ওঠে। যে খেলনা একসময় প্রাণ ছিল সে ‘খেলনা ভাঙার খেলাই’ পরে দারুণ হয়ে ওঠে। অথচ একান্ত একা যখন ভাবতে বসি; তখন আমরা সৌন্দর্যের খোঁজে নামি নিজের ভেতরের গভীর জলে—‘অবহেলায় ফিরিয়ে দেয়া মুখের চেয়ে সুন্দর মুখ নেই।অথচ ফিরিয়ে দেয়া মুখ আর ফেরে না।’(ভাঙা তালার চাবি) আমাদের বড় হওয়া বা ছোট হওয়া; আমাদের চলে যাওয়া বা ফিরে আসা সবই বাধ্যতামূলক। কোনো শিশু যদি মনে করে, আমি বড় হবো না। তাহলেও তার আশা পূর্ণ হবে না, তাকে বড় হতেই হবে। কোনো বড় মানুষ যদি মনে করে, আমি ছোট হবো বা আরও তিন-চার হাত বড় হবো তাহলেও তা হবে না। আমাদের সবকিছুই যেন বাধ্যতামূলক। যেমনভাবে, তাসনুভা অরিনও বলেন, ‘তার অভিমান তাকে নিঃসঙ্গ করে, তাকে বিচ্ছন্ন করে জাগতিক বিষয় থেকে, যা থেকে সে আদৌ বিচ্ছিন্ন নয়।’ তবু তো মানুষকে কিছু একটা শিখে নিতে হয়; কোনো একটা পর্দার আড়ালে যাবার চেষ্টা করতে হয়। কবি একটা পর্বের নাম রেখেছেন, ‘কিছুটা পানি পানির সাথে মিশবে না বলে পাতায় করে যাচ্ছিল’। এখানে পানি পানির সাথেই থাকছে মাঝে শুধু পাতার আড়াল। আবার, শিখে নেবার ব্যাপারটা আসে এভাবে,‘পালকি থেকে নামার পর সবাই হাঁটতে শেখে দু’পায়ে।’(পরাগে বিশ্বাস না থাকলে ফুলকে প্লাস্টিক মনে হয়) আরও চমৎকার কবিতা আর বাক্য বইটিতে আছে। তার সব নিয়ে বললে এ আলোচনা আরও দীর্ঘ হয়ে পড়বে। বরং একটা কবিতা পড়তে পড়তে এ আলোচনা শেষ করতে পারি। বেঁচে আছি অন্য কারো প্রশ্বাস গিলে আমাদের মধ্যে যারা অন্যের শ্বাস নিয়ে বাঁচেআরও বেঁচে থাকার প্রতিশ্রুতি পেতেপৃথিবীর পেটের ভেতর তারা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রাখে। মানুষ আর পৃথিবী সমান্তরালেকাকে যেন কেন্দ্র করে ঘোরে।দেখছি রাত্রি নামছে প্রেতাত্মার পোশাক পরে।একদিন উড়ে গেলে আমি,আমার ঘুম নিয়ে কে ঘুমাবে? যেন আমরা অন্য কারো ঘুম হয়ে, ঘুমিয়ে আছি বহুদিন। ভালোবাসা কবি তাসনুভা অরিনের জন্য। তার কাব্য-বিভা আরও ছড়িয়ে পড়ুক, জড়িয়ে পড়ুক মানুষের হৃদয়ে। আরও পড়ুনপাঁচজন ফজলু: একটা মানুষই কয়েকটা মানুষ চাষাঢ়ে গল্প: বঞ্চিত মানুষের আখ্যান এসইউ
Go to News Site