Collector
Giriş Yap
কসমেটিকোরেক্সিয়া: অল্প বয়সে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার নেশায় বুঁদ কিশোরীরা | Collector
কসমেটিকোরেক্সিয়া: অল্প বয়সে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার নেশায় বুঁদ কিশোরীরা

কসমেটিকোরেক্সিয়া: অল্প বয়সে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার নেশায় বুঁদ কিশোরীরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পারফেক্ট স্কিন’-এর পেছনে ছুটতে গিয়ে ক্রমেই অধিক সংখ্যক কিশোরী জড়িয়ে পড়ছে দীর্ঘ স্কিনকেয়ার রুটিনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি সৌন্দর্য প্রবণতা নয়; বরং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন সংকেত। একসময় ব্রণমুক্ত ত্বকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সাধারণ ফেসওয়াশ বা স্ক্রাবই ছিল কিশোরীদের সৌন্দর্যচর্চার প্রধান উপকরণ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের অনেক শিশুই প্রতিদিন টোনার, সিরাম, রেটিনল, আই ক্রিম, ফেস মিস্ট, গ্লো-বুস্টিং ক্রিমের মতো একাধিক স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করছে । যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সী কিশোরী এলি-মে তার টিকটক ভিডিওতে নিয়মিত নিজের স্কিনকেয়ার রুটিন দেখায়। আট বছর বয়স থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্কিনকেয়ার বিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করছে সে। বর্তমানে টিকটকে তার অনুসারী সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এলি-মে-এর ও তার মা সোফি/ ছবি: বিবিসি এলি-মের মা সোফি জানান, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করে তাদের পরিবার বছরে ৫০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি আয় করে। তিনি বলেন, শুরুতে বিষয়টি ছিল মজার ছলে, কিন্তু পরে এটি পরিবারের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। শিশুদের স্কিন কেয়ার বাজারের বিস্ফোরণ টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা স্ন্যাপচ্যাটে এখন হাজারো শিশুর ভিডিও দেখা যায়, যেখানে তারা ‘গেট রেডি উইথ মি’ বা ‘আফটার স্কুল স্কিন কেয়ার’ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিশুদের বয়স মাত্র তিন বা চার বছর। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাই-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেক নিয়মিত একাধিক স্কিন কেয়ার পণ্য ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে অর্ধেকের দাবি, তারা নিজেদের ত্বকের তথাকথিত সমস্যা সমাধানের জন্য এসব পণ্য ব্যবহার করে। এদিকে সৌন্দর্যপণ্যের এই বাজার এখন বহু বিলিয়ন পাউন্ডের শিল্পে পরিণত হয়েছে ও এর প্রবৃদ্ধি থামার কোনো লক্ষণ নেই। ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’ এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা একটি নতুন শব্দ ব্যবহার শুরু করেছেন- কসমেটিকোরেক্সিয়া। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে অল্প বয়স থেকেই নিখুঁত ত্বক পাওয়ার প্রতি অস্বাস্থ্যকর মাত্রার আসক্তি তৈরি হয় এবং ব্যক্তি অতিরিক্ত সৌন্দর্যপণ্য ব্যবহার করতে শুরু করে। ইতালির মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিওভান্নি দামিয়ানি ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৫৫ জন শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, কসমেটিকোরেক্সিয়ার লক্ষণ থাকা শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্কিনকেয়ার ভিডিও দেখে, প্রতিদিন ১০টি পর্যন্ত পণ্য ব্যবহার করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মেকআপ ছাড়া সামাজিক মেলামেশাও করতে চায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে সৌন্দর্যপণ্য কোম্পানিগুলো ইতালির প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এজিসিএম সম্প্রতি বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচের বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তাদের মালিকানাধীন সেফোরা ও বেনিফিট ব্র্যান্ড শিশু-কিশোরদের জন্য উপযুক্ত নয়- এ তথ্য যথেষ্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে কি না। পাশাপাশি তরুণ মাইক্রো-ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে গোপন বিপণন কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এলভিএমএইচ জানিয়েছে, তারা ইতালির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করছে ও ১৮ বছরের কম বয়সী ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে কাজ করে না। শিশুদের ত্বকের জন্য কতটা নিরাপদ? যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জিন আয়ারের মতে, শিশুদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই প্রায় নিখুঁত অবস্থায় থাকে। ফলে অ্যান্টি-এজিং পণ্য ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই। তার ভাষায়, শিশুদের ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই খুব ভালো থাকে। অথচ তারা এমন পণ্য ব্যবহার করছে, যা মূলত বয়সজনিত বলিরেখা কমানোর জন্য তৈরি। ডা. আয়ার জানান, বর্তমানে আগের চেয়ে বেশি শিশু ত্বকের সমস্যা নিয়ে তার কাছে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহৃত প্রসাধনীর কারণে তাদের ব্রণ, অ্যালার্জি বা কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, রেটিনল নামের উপাদানটি নিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন। এটি ত্বকের কোষ নবায়নের গতি বাড়ায়, যা বয়স্কদের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত চলে। ফলে রেটিনল ব্যবহারে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ত্বক জ্বালা করা, একজিমার মতো র‌্যাশ তৈরি হওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সংবেদনশীলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সৌন্দর্যের চাপে বদলে যাচ্ছে আত্মপরিচয় বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু ত্বকের নয়; এর মানসিক প্রভাবও গভীর হতে পারে। ইতালীয় মনোবিজ্ঞানী আলবার্তো স্টেফানা বলেন, শিশুরা যখন নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলছে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সৌন্দর্যের মানদণ্ড তাদের আত্মসম্মানকে প্রভাবিত করছে। তার মতে, তারা নিজেদের মূল্যায়ন করছে কতগুলো লাইক পেলো বা মানুষ কী মন্তব্য করলো তার ভিত্তিতে। স্টেফানার সাম্প্রতিক গবেষণায় কসমেটিকোরেক্সিয়ার সঙ্গে বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার -এর কিছু মিল পাওয়া গেছে। এটি এমন একটি মানসিক সমস্যা, যেখানে ব্যক্তি নিজের শারীরিক চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ ও লজ্জাবোধে ভোগে। তিনি জানান, সাত বা আট বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও এমন উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, যেখানে তারা নিজেদের চেহারা নিয়ে এতটাই অস্বস্তি বোধ করে যে স্কুলে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায় গবেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করছে। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক জেসিকা রিংরোজের মতে, শিশুরা অনলাইনে যে জীবনধারা দেখে, সেটিকেই আদর্শ জীবন হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তিনি বলেন, যদি তারা সেই তথাকথিত নিখুঁত চেহারা বা জীবন অর্জন করতে না পারে, তাহলে মনে করে তারা কোনোভাবে ব্যর্থ। টিকটক জানিয়েছে, তারা কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে ও ১৮ বছরের কম বয়সীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দেখানোর অনুমতি দেয় না। একই সঙ্গে, অভিভাবকদের জন্য তথ্য ও সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে গবেষকদের মতে, দায়িত্ব শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়; সৌন্দর্যপণ্য কোম্পানি এবং অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাস্তব নাকি ডিজিটাল সৌন্দর্যের ফাঁদ? বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের অনেক শিশু এমন এক সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে, যা বাস্তবে অস্তিত্বই নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ফিল্টার, সম্পাদনা প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অনেক ছবিকে বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে গেছে। ফলে শিশুরা এমন একটি আদর্শ চেহারার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করছে, যা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব নয়। এই কারণেই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সতর্ক করছেন—স্কিনকেয়ার সচেতনতা ভালো, কিন্তু নিখুঁত ত্বকের নেশা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নতুন সংকটে পরিণত হতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি এসএএইচ

Go to News Site