Jagonews24
চামড়া সংগ্রহ হতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ পিস এবার ঋণ মিলেছে মাত্র ৬৫ কোটি টাকা ‘চামড়ার সঠিক মূল্য পেতে হলে সংগ্রহের পরপরই লবণ দিতে হবে, দ্রুত বিক্রি করতে হবে এবং চামড়া ছাড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াতে হবে। চামড়ার মান ভালো না থাকলে শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, বাজারে সেই দাম পাওয়া সম্ভব হবে না।’ জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান ও আঞ্জুমান ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শাহীন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন। জাগো নিউজ: এবার কোরবানির চামড়া সংগ্রহ পরিস্থিতি কেমন দেখছেন? শাহীন আহমেদ: আমাদের ধারণা, এবার প্রায় ৮০ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছে। সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে এখন পর্যন্ত মূলত ঢাকার চামড়াগুলোই এসেছে। ঢাকার বাইরের চামড়া আসা শুরু হয়েছে, তবে বড় পরিসরে আসতে আরও দু-চারদিন সময় লাগবে। আরও পড়ুন চামড়ার বাজারে বিক্রেতা আছে, ক্রেতা নেই এখন পর্যন্ত সাভার শিল্পনগরীতে প্রায় ছয় লাখ পিস চামড়া এসেছে। ৮০ লাখ পশুর মধ্যে ৫০ লাখ গরু এবং ছাগল ও অন্য পশু কোরবানি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ। ফলে আমরা ধারণা করছি, গরুর প্রায় ৪৮ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। আর ছাগলের অর্ধেকের বেশি চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। ছাগলসহ অন্য পশুর ৩০ লাখ পিস চামড়ার মধ্যে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পিস সংগ্রহ করা যাবে। জাগো নিউজ: তাহলে মোট সংগ্রহ কত হতে পারে? শাহীন আহমেদ: এ বছর গরুর প্রায় ৪৮ লাখ পিস এবং ছাগলের ১৫ থেকে ২০ লাখ পিস ধরলে ৬৩ থেকে ৬৮ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হতে পারে। জাগো নিউজ: সরকার এবার চামড়ার দাম কিছুটা বাড়িয়ে দিলেও মাঠপর্যায়ে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো ক্ষতির অভিযোগ করছে। কেন এমন হলো? শাহীন আহমেদ: আমি এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করি। যারা সরকারিভাবে লবণ পেয়েছেন, তারা লবণও বিক্রি করেছেন, আবার চামড়াও বিক্রি করেছেন। কিন্তু অনেক জায়গায় দেখা যায়, চামড়ায় লবণ না দিয়ে রাত ২টা থেকে ৩টার দিকে বিক্রি করতে নিয়ে আসা হয়েছে। একটি পচনধরা বা ক্ষতিগ্রস্ত চামড়া কেউ কিনতে চাইবে না। চামড়ারও একটি মান আছে। আমরা ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বলেছিলাম, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো যেন বিকেলের মধ্যেই নিলাম ও বিক্রি সম্পন্ন করে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি দামের আশায় রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চামড়া ধরে রেখেছে। তখন বাজারে দাম কমে গেছে। আরও পড়ুন চামড়ায় সিন্ডিকেটের থাবা / ‘সরকার শুধু দামই ঠিক করে, চামড়াতো আর কেনে না’ অনেকে অভিযোগ করেছেন, ৬শ থেকে ৭শ টাকায় চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে একটি চামড়া সংগ্রহ করে ট্যানারিতে আনতে পরিবহন, শ্রমিক, লবণসহ নানা খরচ যুক্ত হয়। যেসব মাদরাসার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল, তারা সন্ধ্যার আগেই চামড়া দিয়েছে। সেসব চামড়া আমরা ৮শ থেকে ৮৫০ টাকা বা তারও বেশি দামে কিনেছি। জাগো নিউজ: তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন, চামড়ায় লবণ না লাগানোই দাম না পাওয়ার প্রধান কারণ? শাহীন আহমেদ: এটি বড় কারণগুলোর একটি। চামড়ায় লবণ দিলে সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ে ও বিক্রেতার দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়ে। কিন্তু অনেকেই লবণ ব্যবহার করেন না। ফলে দ্রুত মান নষ্ট হয়। জাগো নিউজ: ছাগলের চামড়ার বড় অংশ নষ্ট হওয়ার কারণ কী? শাহীন আহমেদ: ছাগলের চামড়া ছাড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়েছে। অনেকেই নিজেরাই চামড়া ছাড়াতে গিয়ে ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন। এতে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়। গরুর চামড়ার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। চামড়া যদি কাটাছেঁড়া হয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক মানের ‘লেস কাট’ বা ভালো মানের চামড়া আর থাকে না। ফলে দাম কমে যায়। জাগো নিউজ: ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, ট্যানারি মালিক ও কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? শাহীন আহমেদ: এসব অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়। আগে কোরবানির মৌসুমে ট্যানারি খাতে ৪শ থেকে ৪৮০ কোটি টাকা পর্যন্ত অগ্রিম অর্থায়ন পাওয়া যেত। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ২০১৭ সালের পর থেকে ট্যানারি খাত ধারাবাহিকভাবে লোকসান করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে চামড়া ও ওয়েট-ব্লু বিক্রি করতে হয়েছে। অনেক ট্যানারি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আরও পড়ুন চামড়া রপ্তানিতে প্রধান বাধা আন্তর্জাতিক সনদ বর্তমানে হয়তো ২০ থেকে ২৫টি ট্যানারি কোনোমতে টিকে আছে। এবার কোরবানি মৌসুমে ব্যাংক ঋণ হিসেবে মাত্র ৬৫ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। যেখানে ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকার প্রয়োজন, সেখানে ৬৫ কোটি টাকা খুবই অপ্রতুল। ফলে বাজারে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। মধ্যস্বত্বভোগীদের কিছু ভূমিকা থাকতে পারে। তারা অনেক সময় ৩শ থেকে ৫শ টাকায় চামড়া কিনে ১১শ থেকে ১২শ টাকায় বিক্রি করেন। কিন্তু এর সুবিধাভোগী ট্যানারি মালিকরা নন। জাগো নিউজ: এবার নতুন করে কাঁচা চামড়া রপ্তানির দাবি উঠেছে। আপনারা কী মনে করেন? শাহীন আহমেদ: বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় কাঁচা চামড়া রপ্তানি খুব সহজ বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে হলে কোল্ড চেইন, বিশেষায়িত কনটেইনার ও মানসম্মত সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ও চামড়ার গুণগত মানসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। এসব কারণে কাঁচা চামড়া রপ্তানি বাস্তবায়ন করা কঠিন। আর বাংলাদেশ থেকে কখনোই কাঁচা চামড়া রপ্তানি হয়নি। লবণযুক্ত কাঁচা চামড়াও রপ্তানি হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে দেশের চামড়া শিল্প মূলত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানিনির্ভর। জাগো নিউজ: তাহলে গরিবের এই ন্যায্য হকের সঠিক দাম কীভাবে পাওয়া যাবে? শাহীন আহমেদ: চামড়ার সঠিক মূল্য পেতে হলে সংগ্রহের পরপরই লবণ দিতে হবে, দ্রুত বিক্রি করতে হবে এবং চামড়া ছাড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াতে হবে। চামড়ার মান ভালো না থাকলে শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, বাজারে সেই দাম পাওয়া সম্ভব হবে না। ইএইচটি/এএসএ
Go to News Site