Jagonews24
পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন পর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই ক্রেতা সংকটে পড়েছে বহুল আলোচিত দুই কোম্পানি বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার (৯ জুন) কোম্পানি দুটির শেয়ারের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলে বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। কোম্পানি দুটির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হতেই দিনের সর্বনিম্ন দামে কোম্পানি দুটির শেয়ার লাখ লাখ বিক্রির প্রস্তাব আসে। বিপরীতে শূন্য হয়ে যায় ক্রয় আদেশের ঘর। ফলে লেনদেনের শুরু থেকেই ক্রেতা সংকট দেখা দেয়। ক্রেতা সংকটের কারণে লেনদেনের পুরো সময়জুড়ে বেক্সিমকোর মাত্র ৮ হাজার ২৬টি এবং ইসলামী ব্যাংকের ৪০ হাজার ৪১৬টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। অথচ লেনদেনের পুরো সময়জুড়ে কোম্পানি দুটির কয়েক লাখ শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন দামে বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে রাখেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু ক্রেতা সংকটে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী কোম্পানি দুটির শেয়ার বিক্রি করতে পারেননি। শেয়ারবাজারে লাগাতার পতন ঠেকাতে না পেরে, গত পাঁচ বছরে কয়েক দফায় শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। প্রথমবার করনো মহামারির মধ্যে ২০২০ সালে মার্চে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। তবে ২০২১ সালের জুলাইয়ে তা তুলে নেওয়া হয়। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা দিলে ২০২২ সালের জুলাইয়ে আবারও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বিএসইসি। এ পর্যায়ে শেয়ার লেনদেন ব্যাপক কমে গেলে সমালোচনায় পড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পর্যায়ক্রমে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয় বিএসইসি। তবে অদৃশ্য কারণে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ফ্লোর প্রাইস অব্যাহত রাখা হয়। স্টেকহোল্ডারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে সোমবার (৮ জুন) কোম্পানি দুটির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব। যে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় আজ মঙ্গলবার। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার কারণে কোম্পানি দুটির শেয়ারের ব্যাপক দরপতন হলেও, বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন মূল্য সংশোধনের মাধ্যমে এখন কোম্পানি দুটির শেয়ার দাম যুক্তিসংগত পর্যায়ে পৌঁছাবে। তারা বলছেন, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার ফলে শেয়ারের প্রকৃত বাজারদর নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে স্থিতিশীল থাকা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় শুরুতে বিক্রির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে যেসব শেয়ারে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছেন। তারা বলেন, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের ফলে স্বল্পমেয়াদে দরপতন ও বিক্রির চাপ দেখা দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়াবে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফ্লোর প্রাইসের কারণে দীর্ঘদিন ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দাম ৩২ টাকা ৬০ পয়সায় আটকে ছিলো। তবে ২০২৪ সালে গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ফ্লোর প্রাইস ভেঙে হুঁ হুঁ করে উপরে উঠতে থাকে কোম্পানিটির শেয়ার দাম। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৭০ টাকা ৪০ পয়সা পর্যন্ত উঠে। এরপর কয়েক দফায় উঠা-নামা করলেও কোম্পানিটির শেয়ার দাম ফ্লোর প্রাইসের ওপরেই ছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দাম কমতে শুরু করে। দফায় দফায় দাম কমে মে মাসের শুরুতেই কোম্পানিটির শেয়ার দাম আবার ফ্লোর প্রাইসে চলে আসে। এরপর ওই ফ্লোর প্রাইসেই আটকে থাকে কোম্পানিটির শেয়ার দাম। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশে মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ার দামের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলে লেনদেনের শুরুতেই বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির কয়েক লাখ শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন দামে বিক্রির প্রস্তাব বসান। শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটির ৪০ হাজার ৪১৬টি শেয়ার ১১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অপরদিকে বেক্সিমকোর শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারিত ছিল ১১০ টাকা ১০ পয়সা। এই দামে দিনের পর দিন বিনিয়োগকারীরা বিপুল শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দিলেও ক্রেতারা সংকটে বিক্রি হচ্ছিল না। মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও, পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। এদিন লেনদেন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির কয়েক লাখ শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন ৯৯ টাকা ১০ দামে বিক্রির আদেশ দেন। অপরদিকে ক্রেতার ঘর ছিল শূন্য। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এই চিত্র অব্যাহত থাকে। ক্রেতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটির ৮ হাজার ২৬টি শেয়ার ৮ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটির মতে, এ সিদ্ধান্ত বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর করে স্বাভাবিক লেনদেন পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে দীর্ঘদিন ধরে ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকায় স্বাভাবিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল এবং বাজারে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছিল। তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইসের কারণে মার্জিন ঋণগ্রহীতা বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক ইক্যুইটির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছিল। ডিবিএ সভাপতি বলেন, এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা নিরসন, স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও গতিশীল করবে। এমএএস/এমএএইচ/
Go to News Site