Jagonews24
বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি মানুষের কমতে থাকা আস্থা—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে পৃথিবী। এর মধ্যেও ফুটবল বিশ্বকাপকে ভাবা হতো এমন এক বৈশ্বিক আয়োজন, যা সব সংকটের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—ফুটবলে এটাই কি তবে শেষ বিশ্বকাপ? আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটি অবান্তর মনে হতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ আর ফিফার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন যে রূপ নিয়েছে, তাতে বিশ্বকাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো মার্কিন সমর্থকদের নিষিদ্ধ করতে পারে। এর জবাবে ফিফা স্পেনকে নিষিদ্ধ করলে উয়েফা স্পেনের পাশে দাঁড়াবে। রাজনীতির মাঠ ও ফুটবল বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বকাপ বরাবরই বিভিন্ন দেশের সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ১৯৩৪ সালে ইতালির মুসোলিনি কিংবা ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল কুখ্যাত কিছু উদাহরণ। এমনকি ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বা ২০০৬ সালে জার্মানির সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের পেছনেও ছিল জাতীয় এজেন্ডা—ফ্রান্স চেয়েছিল বহুসংস্কৃতিবাদের প্রচার আর জার্মানি চেয়েছিল তাদের নতুন দেশপ্রেমের ব্র্যান্ডিং করতে। আরও পড়ুন বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি? খোদ বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফাও নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়াকে যৌথ আয়োজক হতে বাধ্য করেছিল এবং ২০১০ সালে আফ্রিকায় প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। সমস্যা কোথায় বিগত এক দশক ধরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এটি টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ, যা আয়োজক দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা পররাষ্ট্রনীতির কারণে বয়কটের ডাকের মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে রাশিয়া এবং ২০২২ সালে কাতার নানা বিতর্কের পরও সফলভাবে টুর্নামেন্ট শেষ করেছিল। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে চলতি বিশ্বকাপ কি নির্বিঘ্নে শেষ হতে পারবে? ‘ট্রাম্পের বিশ্বকাপ’ ও নজিরবিহীন সংকট যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এবারের বিশ্বকাপ এমন কিছু নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি: অবৈধ যুদ্ধ: এবারই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অন্য একটি দেশের সঙ্গে অবৈধ যুদ্ধে লিপ্ত। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চারটি দেশের নাগরিকদের ওপর আয়োজক দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সহ-আয়োজককে হুমকি: আয়োজক দেশের শীর্ষ নেতা খোদ নিজের সহ-আয়োজক দেশকে (কানাডা) একীভূত করার হুমকি দিয়েছেন এবং অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করেছেন। অভিবাসন নীতি ও টিকিটের উচ্চমূল্য: আমেরিকার কঠোর অভিবাসন নীতি এবং টিকিটের আকাশচুম্বী দামের কারণে অনেক সাধারণ সমর্থক এবার মাঠে আসা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতীতের খামখেয়ালিপনা এবং অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ট্র্যাক রেকর্ড ফুটবল বিশ্বে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ফিফার ঘরে কোন্দল বিশ্বকাপের এই বাহ্যিক সংকটের পাশাপাশি ফিফার ঘরের ভেতরের ভাঙনও এখন স্পষ্ট। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা এবং ফিফার মধ্যকার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। ফুটবল বিশ্বের সিংহভাগ টাকা যেখানে ইউরোপে, সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে বাকি বিশ্বের হাতে। আরও পড়ুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত? উয়েফার চ্যাম্পিয়নস লিগকে টেক্কা দিতে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়েছে। ফিফা সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনো এখন ইউরোপ ছেড়ে বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন মিয়ামিতে। খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার চাপ নিয়ে এই দুই সংস্থার দ্বন্দ্বে তৈরি হয়েছে নতুন খেলোয়াড় ইউনিয়নও। অন্যদিকে, আফ্রিকার ফুটবল কনফেডারেশনও (সিএএফ) গভীর সংকটে নিমজ্জিত। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার দুই মাস পর সেনেগালের কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে নিয়ে আয়োজক মরক্কোকে ট্রফি দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা আফ্রিকান ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তির পথে? ফিফার বিশ্বাসযোগ্যতা এভাবে হুট করে ভেঙে পড়া অসম্ভব কিছু নয়। অতীতে অলিম্পিক গেমসের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অলিম্পিকের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও ১৯৭৬, ১৯৮০ এবং ১৯৮৪ সালের উপর্যুপরি বয়কটের কারণে অলিম্পিক প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। বক্সিংয়ের মতো খেলাও বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার কারণে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আরও পড়ুন ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আগ্রাসী নীতি ফিফার সদস্য দেশগুলোর জোট ও ভোটিং ব্লকে বড় ফাটল ধরাতে পারে। উদাহরণ হিসেবে একটি কাল্পনিক কিন্তু বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির কথা ভাবা যাক: কোনো স্প্যানিশ সমর্থক যদি আমেরিকার অভিবাসন দপ্তরে (আইসিই) আটক হয়ে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মারা যান, তবে স্পেন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলবে। ফিফা ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় যদি তাতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো মার্কিন সমর্থকদের নিষিদ্ধ করতে পারে। এর জবাবে ফিফা স্পেনকে নিষিদ্ধ করলে উয়েফা স্পেনের পাশে দাঁড়াবে এবং ক্ষুব্ধ আফ্রিকান দেশগুলো বিশ্বকাপ বয়কট করতে পারে। আজকের যুগে অবাস্তব মনে হওয়া অনেক কিছুই বাস্তব রূপ নিচ্ছে। আরও পড়ুন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবার এত কম কেন? সমাপ্তি কি তবে আসন্ন? ১৯৩০ সালে যাত্রার পর থেকে বিশ্বকাপের পরিধি কেবল বেড়েই চলেছে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই কোনো কিছুর প্রবৃদ্ধি চিরকাল চলে না। ফিফা আজ যে প্রহসনে পরিণত হয়েছে, তাতে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হওয়া নিয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। আর যদি তা হয়ও, কতগুলো দেশ তাতে অংশ নেবে বা কয়জন মানুষ তা নিয়ে মাথা ঘামাবে, সেটি হবে বড় প্রশ্ন। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/
Go to News Site