Jagonews24
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা ৪৫ দিনের হামলা-পাল্টা হামলার পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে পাকিস্তান। শুরু থেকেই বলা হয়েছিল, লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব ফ্রন্ট এই যুদ্ধবিরতির আওতায় থাকবে। পাকিস্তানও সেই অবস্থান সমর্থন করে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইসরায়েল সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও তারা লেবাননে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাতে থাকে। এতে হতাহতের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তখন তেহরান সতর্ক করে জানায়, লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। বৈরুত হামলার জবাবে সরাসরি ইরানি আঘাত সতর্কবার্তার পর বাস্তব পদক্ষেপ নিতে দেরি করেনি ইরান। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে ইসরায়েলি হামলার জবাবে রোববার সন্ধ্যায় ইসরায়েলের ওপর সরাসরি হামলা চালায় তেহরান। আরও পড়ুন>পাল্টাপাল্টি হামলা থামানোর ঘোষণা দিলো ইরান-ইসরায়েলইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’, ৩৭ বার একই কথা বলেছেন ট্রাম্প এর আগে ইরান বারবার জানিয়েছিল, ইসরায়েল যদি বৈরুতকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে তারা তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সমর্থনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। ইরানের হামলার পর ইসরায়েলও পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের বিমানবাহিনী ইরানের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, উভয় পক্ষ আবারও হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে। ৮ জুন ভোর পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চললেও পরে আর কোনো বড় ধরনের আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিস্তৃত যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত কমেছে, যদিও বিশ্লেষকদের মতে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। মিত্রদের রক্ষায় নতুন বার্তা ইরানের এই পদক্ষেপকে অনেক পর্যবেক্ষক দেশটির আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ইরান শুধু প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে নেই; বরং মিত্রদের ওপর হামলার জবাবে অগ্রিম প্রতিরোধমূলক হামলা চালাতেও প্রস্তুত। হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বার্তাই দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত যুদ্ধবিরতির পর শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ইরানের উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের পদক্ষেপের জেরে দেশটির নৌবন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারও আটকানো হয়েছে। এমনকি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরানের উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। তেহরানও এসব হামলার জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে যাচ্ছে। ২ জুন মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন ও রাডার স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর আগে মার্কিন নৌবাহিনী বা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিবেচিত বিভিন্ন ট্যাঙ্কারেও হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তেহরানের বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—যে কোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং কোনো শক্তির কাছেই নতি স্বীকার করা হবে না। আরও পড়ুন>পাল্টাপাল্টি হামলা থামানোর ঘোষণা দিলো ইরান-ইসরায়েলইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’, ৩৭ বার একই কথা বলেছেন ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নতুন বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও ইরান এখনো কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রেখেছে বলে দাবি করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ এই প্রণালিতে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো চালু করেছে তেহরান। দেশটির দাবি, হরমুজ প্রণালি তাদের মূল ভূখণ্ডের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নবগঠিত ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ হরমুজ ও এর আশপাশের ২২ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সামুদ্রিক এলাকার ওপর তদারকির দাবি করেছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, এই এলাকার কিছু অংশ ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমার মধ্যেও বিস্তৃত। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী সব জাহাজকে আগে থেকেই ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি সুরক্ষা ফি ও ট্রানজিট চার্জ আদায়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযান, সমুদ্র-মাইন এবং জিপিএস ও স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করছে। পারমাণবিক ইস্যুতে অনড় তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় দিতে রাজি হয়নি মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরান। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের কাছে কোনো পর্যায়ের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা থাকতে দেওয়া হবে না। এ জন্য উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে ওয়াশিংটন। কিন্তু এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে তেহরান। ইরান এখনই এই প্রশ্নে কোনো আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। একই সঙ্গে দেশটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা কি সত্যিই ধ্বংস হয়েছে? মার্কিন প্রশাসন একাধিকবার দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করছে। তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বরাবর অবস্থিত ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে প্রায় ৩০টিই আবার সক্রিয় হয়েছে। এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলা মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আগে ইরানের যে ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও মোবাইল লঞ্চার ছিল, তার প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো অক্ষত রয়েছে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অব্যবহৃত’ আধুনিক অস্ত্রের দাবি ইরানের এক সামরিক সূত্রের দাবি, দেশটির হাতে এমন কিছু আধুনিক অস্ত্র রয়েছে, যা এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। ওই সূত্রের ভাষ্য, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব অস্ত্র বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো পরীক্ষিত নয়। তবে প্রয়োজন হলে সেগুলো ব্যবহার করা হতে পারে। এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখছেন। মোজতবা খামেনির ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশের নীতিনির্ধারণে আগের তুলনায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। মার্কিন সিনেটে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিনে তার বাবা ও পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে খুব বেশি না এলেও মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীরভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের বর্তমান অবস্থান, সামরিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি দৃশ্যমান সমর্থন এবং পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে দেশটি এক নতুন কৌশলগত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এমএসএম
Go to News Site