Collector
Giriş Yap
বায়েজিদ বোস্তামি: আত্মবিলয়ের সন্ধানে এক মহাসাধকের জীবন | Collector
বায়েজিদ বোস্তামি: আত্মবিলয়ের সন্ধানে এক মহাসাধকের জীবন

বায়েজিদ বোস্তামি: আত্মবিলয়ের সন্ধানে এক মহাসাধকের জীবন

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বায়েজিদ বোস্তামির নাম উচ্চারিত হয়েছে শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও ভালোবাসার সঙ্গে। কেউ তাকে বলেন ‘সুলতানুল আরেফিন’—আরেফদের সম্রাট; কেউ বলেন প্রেমময় সাধক; আবার কেউ তাকে দেখেন আত্মবিলয়ের দর্শনের একজন অগ্রদূত হিসেবে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বায়েজিদ বোস্তামি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার মাতৃভক্তির গল্পের মাধ্যমে। ছোটবেলায় পাঠ্যবই কিংবা নৈতিক শিক্ষার নানা গল্পে আমরা পড়েছি সেই বালকের কথা, যিনি গভীর রাতে মায়ের জন্য পানি আনতে গিয়ে সারা রাত পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু বায়েজিদ বোস্তামির জীবন কি কেবল এই একটি গল্পেই সীমাবদ্ধ? না, তার জীবন অনেক বেশি বিস্তৃত, রহস্যময় এবং চিন্তার খোরাক জাগানিয়া। পারস্যের বাস্তাম থেকে আত্মিক যাত্রার শুরু খ্রিষ্টীয় ৮০৪ সালে তৎকালীন পারস্যের কুমিস অঞ্চলের বাস্তাম নগরে জন্মগ্রহণ করেন আবু ইয়াজিদ তাইফুর ইবনে ঈসা ইবনে সুরাশান আল-বিস্তামি। ইতিহাস তাকে চেনে বায়েজিদ বোস্তামি নামে। ‘বোস্তামি’ বা ‘বিস্তামি’ উপাধিটি এসেছে তার জন্মস্থান বাস্তাম থেকে। তার পিতার নাম ছিল তাইফুর। দাদা সুরাশান ছিলেন জরথুস্ত্র ধর্মের অনুসারী। পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বায়েজিদের শৈশব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে জানা যায়, তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ঘর ও মসজিদের মধ্যে। পারিবারিক পরিবেশ ছিল গভীরভাবে ধর্মমুখী। তার বাবা-মা ছিলেন পরহেজগার ও আল্লাহভীরু। জাগতিক চাকচিক্য তাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে ছোটবেলা থেকেই বায়েজিদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক ধরনের অন্তর্মুখী ও আত্মানুসন্ধানী চরিত্র। মাতৃভক্তির সেই অমর কাহিনি বায়েজিদ বোস্তামির নাম উচ্চারিত হলে যে গল্পটি সর্বাগ্রে স্মরণে আসে, সেটি তার মায়ের প্রতি ভালোবাসার গল্প। এক গভীর রাতে তার মা ঘুম থেকে জেগে পানি চাইলেন। কিন্তু ঘরে পানি ছিল না। ছোট্ট বায়েজিদ সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন। অনেক দূরের ঝর্ণা থেকে পানি নিয়ে যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন তার মা আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। মায়ের ঘুম ভাঙিয়ে পানি দিতে তার মন সায় দিল না। তাই তিনি পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। যদি মা আবার জেগে ওঠেন এবং পানি চান! এভাবে পুরো রাত কেটে গেল। সকালে ঘুম ভেঙে মা দেখলেন, ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ভিজে উঠল আবেগে। তিনি সন্তানের জন্য দোয়া করলেন। ঐতিহাসিকভাবে এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করা কঠিন। নির্ভরযোগ্য প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে এ কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে লোকসাহিত্য, কবিতা ও নৈতিক শিক্ষার সাহিত্য এটিকে অমর করে রেখেছে।  সুফিবাদের নতুন এক দিগন্ত বায়েজিদ বোস্তামির আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ধীরে ধীরে নতুন রূপ লাভ করছিল। তার আগে সুফিবাদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ত্যাগ, তাকওয়া, ইবাদত ও আত্মসংযম। কিন্তু বায়েজিদ এই ধারায় নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেন—খোদা প্রেমের গভীর অনুভূতি এবং আত্মবিলয়ের ধারণা। তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ‘ফানা’—অর্থাৎ নিজের অহং, ব্যক্তিসত্তা ও আত্মগর্বকে বিলীন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যতক্ষণ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে মুগ্ধ থাকে, ততক্ষণ সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। এই উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে তার নানা উক্তি ও অভিজ্ঞতায়। মক্কার পথে তিনটি সফর বায়েজিদ বোস্তামির নামে প্রচলিত সবচেয়ে বিখ্যাত বর্ণনাগুলোর একটি হলো তার মক্কা সফরের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, প্রথমবার মক্কায় গিয়ে তিনি শুধু কাবাঘর দেখেছিলেন। তখন তার মনে হয়েছিল, এটি যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়বার গিয়ে তিনি কাবা ও কাবার প্রভু—উভয়ের উপস্থিতি অনুভব করেন। কিন্তু তাতেও তিনি পরিতৃপ্ত হননি। তৃতীয়বার গিয়ে তিনি অনুভব করলেন, তার সামনে কেবল আল্লাহ আছেন। কাবার বাহ্যিক রূপ যেন তার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে গেছে। এই বর্ণনাকে অনেকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করেন। বাহ্যিক আচার থেকে অন্তরের গভীর উপলব্ধির দিকে মানুষের যাত্রার প্রতীক হিসেবে তারা এই বক্তব্যকে দেখেন। আবার কেউ কেউ এটিকে সুফি আধ্যাত্মিকতার উচ্চতম স্তরের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেন। ‘নিজেকে ত্যাগ কর’ বায়েজিদের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘আমি স্বপ্নে আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে পৌঁছার পথ কী? তিনি বললেন, নিজেকে ত্যাগ কর; দেখবে পৌঁছে গেছ।’ এই কথার মধ্যে তার সমগ্র দর্শনের সারমর্ম নিহিত। সুফিবাদে ‘নফস’ বা অহংকে মানুষের উন্নতির পথে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক মনে করা হয়। মানুষের আত্মগরিমা, ক্ষমতার লোভ, খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা এবং নিজেকে বড় ভাবার প্রবণতা তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বায়েজিদের মতে, এই ‘আমি’কে অতিক্রম করতে পারলেই সত্যিকারের আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জন সম্ভব। ‘আমার বয়স চার বছর’ বায়েজিদ বোস্তামির জীবনকে ঘিরে প্রচলিত আরেকটি বিখ্যাত ঘটনা তার মৃত্যুশয্যার। মৃত্যুর আগে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার বয়স কত? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার বয়স চার বছর। সত্তর বছর ধরে আমার চোখের ওপর পর্দা ছিল। মাত্র চার বছর আগে সেই পর্দা সরেছে।’ আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং আধ্যাত্মিক অর্থে তিনি এই কথা বলেছিলেন। তার মতে, প্রকৃত উপলব্ধি অর্জনের আগে মানুষের জীবন যেন ঘুমন্ত অবস্থার মতো। সত্যকে জানার পরই মানুষের প্রকৃত জীবন শুরু হয়। কারামত নয়, শরিয়তই আসল অনেক সুফি সাধককে ঘিরে অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত থাকলেও বায়েজিদ বোস্তামির একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি কাউকে বাতাসে উড়তে দেখো, তবুও তাকে অলি মনে করো না। বরং দেখো, সে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে কি না।’ এই বক্তব্যে তার ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিকতার নামে অলৌকিকতা বা চমকপ্রদ ঘটনার প্রতি অন্ধ আকর্ষণকে তিনি সমর্থন করেননি। বরং তিনি জোর দিয়েছেন শরিয়ত, সুন্নত এবং নৈতিক চরিত্রের ওপর। মৃত্যুর পর কিংবদন্তির জন্ম ৮৭০ সালের পর কোনো এক সময়ে বায়েজিদ বোস্তামি ইন্তেকাল করেন। ধারণা করা হয়, তাকে তার জন্মস্থান বাস্তামেই সমাহিত করা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার জনপ্রিয়তা এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তার নামে মাজার ও স্মৃতিসৌধ গড়ে ওঠে। তুরস্ক থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে তার স্মৃতি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থিত বায়েজিদ বোস্তামির মাজার এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদিও ঐতিহাসিকভাবে তার চট্টগ্রাম সফরের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধার কেন্দ্র হয়ে আছে। এখানে থাকা বিখ্যাত ‘বোস্তামী কাছিম’ও একটি সাংস্কৃতিক ও জীববৈচিত্র্যগত বিস্ময় হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের মানুষ, নাকি কিংবদন্তির নায়ক? বায়েজিদ বোস্তামিকে ঘিরে ইতিহাস ও লোককথা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। তার জীবনের অনেক ঘটনা যাচাই করা সম্ভব নয়। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। তার শিক্ষা মানুষকে আত্মম্ভরিতা ত্যাগ করতে, অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জন করতে এবং বাহ্যিক আড়ম্বরের পরিবর্তে অন্তর্নিহিত সত্যের অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়। আজ থেকে প্রায় বারোশ বছর আগে পারস্যের একটি ছোট শহরে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটির নাম এখনো উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ তিনি কেবল একজন সুফি সাধক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আত্মাকে জানার, অহংকে অতিক্রম করার এবং স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার এক নিরন্তর যাত্রার প্রতীক। ওএফএফ

Go to News Site