Jagonews24
১৯৮৬ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। তবে এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জয় ছাপিয়ে এখনো আলোচনায় দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ বা হাত দিয়ে গোল করা এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি।’ এই বিশ্বকাপ নিয়ে এত এত আলোচনা আর কাব্যগাথা হয়েছে যে, এর যেন কোনো শেষ নেই। তবে কিছু গল্প সম্ভবত পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল মেক্সিকো। মেক্সিকো সিটির প্রচণ্ড গরম, উচ্চতার কারণে কার্লোস বিলার্দোর নিখুঁত পরিকল্পনায় সাজানো অনুশীলন সেশন, কিংবা সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনার অবিশ্বাসী সাংবাদিকদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া তীক্ষ্ণ ও স্মরণীয় মন্তব্য, কত কিছুই ছিল ওই আসরে। তবে এত কিছুর ভিড়ে আরেকটি গল্পও আছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরা ‘নকল’ জার্সির গল্প। ১৯৭৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে পরেবার (১৯৮২ সালে) লুইস মেনোত্তির দল দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। সেবার মাত্র ২১ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা ম্যারাডোনা ব্রাজিলের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখেন। পরের বিশ্বকাপেও ফেভারিট ছিল না ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের আগে দলের ফলাফলও খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। আর্জেন্টিনা তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সামরিক শাসনের পর রাউল আলফন্সিনের তরুণ গণতন্ত্র নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে ব্যস্ত। তবে ইতিহাস বারবারই সাক্ষ্য দেয়, ফুটবল সবসময়ই মানুষের মুক্তির পথ বের করে দেয়। তবে তখনকার অবস্থায় গ্রুপ পর্ব পার করাকেও অনেকের কাছেই সাফল্য হিসেবে দেখার কথা বলছিল। তবে দিয়েগো ম্যারাডোনা তো অন্য ধাতু দিয়েই গড়া। ২৫ বছর বয়স, দলের অধিনায়ক ততদিনে ক্লাব ফুটবলে ইতালির নাপোলিতে প্রায় দেবতার মর্যাদাও পেয়ে গেছেন। এরপর এলো ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপ, আগের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে লাল কার্ড, দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায়। সবমিলিয়ে জেদ ছিল আকাশ সমান। কোচ বিলার্দো পুরো দলকেই সাজিয়েছিলেন ১০ নম্বর জার্সিধারী ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে। বিলার্দোও অনুশীলনে একই কথা জোর দিয়ে বলতেন, ‘দিয়েগোই কেন্দ্রবিন্দু। আমরা সবাই খেলি যাতে ওর সেরাটা বেরিয়ে আসে।’ মেক্সিকো সিটির উচ্চতা, প্রচণ্ড গরম এবং বিশ্বকাপের নানা বাস্তব সমস্যা, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি ছিল। এমন নানা সমস্যার মধ্যে আবার জার্সি সংকটে পড়ে আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন, কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার কথা আর্জেন্টিনার। এর চার বছর আগেই ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ফলে ফুটবল ম্যাচ তখন হয়ে গিয়েছিল মর্যাদার চেয়েও বেশি কিছু। ফিফা আর্জেন্টিনাকে জানায়, ইংল্যান্ডের সাদা জার্সির সঙ্গে পার্থক্য বোঝাতে তাদের গাঢ় রঙের জার্সি পরতে হবে। কিন্তু তখন প্রচণ্ড গরমের উপযোগী কোনো বিকল্প জার্সি আর্জেন্টিনার কাছে ছিল না। তাদের কাছে থাকা একমাত্র জার্সিগুলো ছিল মোটা সুতির কাপড়ে তৈরি- ভারী, অস্বস্তিকর এবং মেক্সিকোর মধ্যাহ্নের তীব্র গরমে প্রায় অযোগ্য। বহু বছর পর অস্কার রুগেরি ওই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘তারা তেপিতোতে গিয়েছিল, কারণ হেক্টর জেলাদা জায়গাটা চিনত। সে একজন কিটম্যানকে একটি ব্যাকপ্যাক দিয়ে পাঠিয়েছিল এবং সে একটি মোটা জার্সি নিয়ে ফিরে আসে। পরে তাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের তো খেলতেই হতো। এরপর তারা অন্য জার্সির খোঁজে বের হয়, আর সেগুলোই আমাদের পছন্দ হয়েছিল।’ নিয়তি যেন আর্জেন্টিনাকে এক অদ্ভুত সংকটে ফেলে দিয়েছিলেন- হয় দমবন্ধ করা গরমে ভারী জার্সি পরে খেলতে হবে, নয়তো শহরের ভেতর ঘুরে নতুন জার্সি খুঁজে বের করতে হবে। আর ঠিক তখনই গল্পে প্রবেশ করে তেপিতো। তেপিতো মেক্সিকো সিটির একটি কিংবদন্তিতুল্য এলাকা- একই সঙ্গে প্রাণবন্ত, জনপ্রিয়, বিপজ্জনক এবং আকর্ষণীয়। ‘কঠিন পাড়া’ হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা-বাণিজ্য, রাস্তার সংস্কৃতি এবং নকল করে নতুন কিছু তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত। আশির দশকে তেপিতো পাইরেটেড পণ্যের জন্য কুখ্যাত ছিল। সিনেমা থেকে শুরু করে খেলাধুলার সামগ্রী- সবকিছুরই নকল সংস্করণ সেখানে পাওয়া যেত। বিশ্বকাপের উন্মাদনায় তখন তেপিতোর রাস্তাগুলো ভরে গিয়েছিল বিভিন্ন জাতীয় দলের জার্সিতে। এর অনেকগুলোই ছিল উচ্চমানের নকল, স্থানীয় কারখানায় তৈরি, যেগুলোর কাপড় ছিল অফিসিয়াল জার্সির চেয়ে হালকা। হতাশাজনক পরিস্থিতিতে সমাধান খুঁজতে গিয়ে আর্জেন্টিনার কিটম্যানদের একটি দল, রিজার্ভ গোলরক্ষক হেক্টর জেলাদার সহায়তায়, তেপিতোর সরু গলিতে প্রবেশ করে। সেখানে যখন দোকানে গিরে জার্সি পছন্দ হলো, তখন দর কষাকষির সময় দোকানদাররা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আর্জেন্টিনা দলের প্রকৃত সদস্যরা তাদের কাছ থেকে এমন জার্সি কিনছে, যেগুলো তারা নিজেরাও জানত নকল। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য তখন ওই নকল জার্সিই হয়ে উঠেছে ত্রাণকর্তা।’ জার্সিগুলো ছিল হালকা নীল রঙের পলিয়েস্টার কাপড়, তাতে সূচিকর্ম করা লে কক স্পোর্তিফের লোগো। অফিসিয়াল জার্সির সঙ্গে প্রায় হুবহু মিল থাকলেও এগুলো ছিল অনেক বেশি আরামদায়ক। তবে শুধু জার্সি হলেই তো হবে না সেগুলো ম্যাচ অফিশিয়ালে পরিণত করতেই হবে। জার্সিগুলোতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) ব্যাজ এবং খেলোয়াড়দের নম্বর লাগানোর কাজ শুরু হয় এরপর। ইস্ত্রি, সুই-সুতা, কাটা কাপড়- সবকিছু ব্যবহার করে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার হোর্হে ভালদানো সেই সময়ের স্মৃতচারণ করতে গিয়ে বললেন, ‘একটি চকচকে নীল জার্সি হাজির হলো, যার নম্বরগুলো ছিল রূপালি রঙের। ম্যারাডোনা বলল, ‘কী সুন্দর জার্সি!’ আমরা সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’ এরপরের অংশটুকু ইতিহাস। সেই নকল জার্সি পরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। আর মাঠে একই ম্যাচে বিখ্যাত ও কুখ্যাত দুই মুহূর্তেরই জন্ম দেন ম্যারাডোণা। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যারাডোনা এমন একটি মুহূর্ত সৃষ্টি করেন, যা আজও বিতর্কের জন্ম দেয়। ‘হ্যান্ড অব গড’। একটি লাফ, হাতে সূক্ষ্ম স্পর্শ, আর বল গিয়ে জড়িয়ে যায় ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের জালে। ইংলিশ খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বেন নাসের গোলটি বৈধ ঘোষণা করেন। ঘটনাটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বুদ্ধি, কৌশল, আর অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলার ক্ষমতা। ওই কুখ্যাত গোলের মাত্র চার মিনিট পর ম্যারাডোনা জন্ম দেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত, গোল অব দ্য সেঞ্চুরি। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি একে একে পাঁচজন প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন এবং ঠান্ডা মাথায় শিলটনকে পরাস্ত করলেন। একটি গোল, যা আজও ফুটবল একাডেমিগুলোতে বিশ্লেষণ করা হয়। পুরো স্টেডিয়াম যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যারাডোনা আবারও তার জাদু দেখান। আর ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে হোর্হে ভালদানো এবং হোর্হে বুরুচাগার গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন পূরণ করে। এই পুরো অভিযানে দলটি খেলেছে এমন এক মানসিকতা নিয়ে, যেখানে কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং রাস্তার চতুরতা একসঙ্গে কাজ করেছে। নীল তেপিতো জার্সিটি আর কখনও ব্যবহার করেনি আর্জেন্টিনা। কিছু জার্সি ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে, কিছু হারিয়ে গেছে। ২০২২ সালে ম্যারাডোনার পরা জার্সিটি নিলামে বিক্রি হয় বাংলাদেশের মুদ্রায় ৮০ কোটি টাকায়। এসকেডি/আইএইচএস/
Go to News Site