Collector
Giriş Yap
পিরিয়ডের সময় ক্লান্তি, ব্রণ, মুড সুইং কেন হয়? | Collector
পিরিয়ডের সময় ক্লান্তি, ব্রণ, মুড সুইং কেন হয়?

পিরিয়ডের সময় ক্লান্তি, ব্রণ, মুড সুইং কেন হয়?

এতদিন অনেক মেয়েকেই শুনতে হতো- তুমি অলস, একটু কম খাও, ওজন কমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে, এইটা তো পিরিয়ডের সমস্যা? এটা মেয়েদের নরমাল ব্যাপার! কিন্তু চিকিৎসকেরা এখন বলছেন, বিষয়টা এতটা সহজ না। এটা শুধু “পিরিয়ডের সমস্যা” না। বরং এটা পুরো শরীরের হরমোন, মেটাবলিজম, এনার্জি আর মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত একটি জটিল রোগ।যেটাকে এতদিন আমরা পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা PCOS নামে চিনতাম, সেটাকে এখন অনেক বিশেষজ্ঞ নতুনভাবে দেখছেন “PMOS” বা “পলিম্যাটাবলিক ওভারি সিন্ড্রোম হিসেবে। অর্থাৎ- এটা শুধু অনিয়মিত পিরিয়ডের গল্প না। এটা সেই ক্লান্তির গল্প, যেখানে ঘুমিয়েও শরীর দুর্বল লাগে। যেখানে কম খেয়েও ওজন কমে না।আপনার প্রতিদিনের অকারণ ক্লান্তি, হুটহাট মুড সুইং, মুখে নতুন করে ব্রণ ওঠা, অতিরিক্ত চুল পড়া কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়াকে চিকিৎসকেরা পলিম্যাটাবলিক ওভারি সিন্ড্রোম হিসেবে দেখছেন।তাহলে প্রশ্ন হলো, এই PMOS আসলে কী? কেন হয়? কীভাবে বুঝবেন আপনার এই সমস্যা আছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এর থেকে মুক্তির উপায় কী? আরও পড়ুন: ওজন কমাতে রাতে খেতে পারেন ৩ খাবারPMOS কী এবং কেন এই নাম বদল?সহজ ভাষায় বললে, এই নাম পরিবর্তন শুধু খাতার কলমে নতুন একটা শব্দ যোগ হওয়া না। এটা আসলে কোটি কোটি নারীর প্রতিদিনের কষ্ট, ক্লান্তি আর লড়াইকে আরও সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা।কেননা, এতদিন Polycystic Ovary Syndrome বা PCOS নামটা শুনলে অনেকের মনে হতো, এটা শুধু পিরিয়ড বা ওভারির সমস্যা। যেন পিরিয়ড ঠিক হয়ে গেলেই সব ঠিক! কিন্তু চিকিৎসকেরা এখন বলছেন, বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক বড়। কারণ এই সমস্যাটা শুধু ওভারিতে সীমাবদ্ধ না। এটা পুরো শরীরের হরমোন, মেটাবলিজম, মানসিক স্বাস্থ্য আর এনার্জির সাথেও জড়িত। আর সেই কারণেই এখন অনেক বিশেষজ্ঞ এটাকে PMOS বা “Polymetabolic Ovary Syndrome” নামে ব্যাখ্যা করছেন।এই নতুন নামটা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, এটা শুধু “পিরিয়ডের সমস্যা” না। এটা এমন একটি কন্ডিশন, যা একজন নারীর শরীর, মন, ঘুম, ওজন, এনার্জি-সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।অর্থাৎ, নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো সমস্যাটাকে ছোট করে না দেখে, পুরো বিষয়টাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে বোঝা।উপসর্গ বা লক্ষণPMOS একটা মেয়ের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলে, চলুন এবার একটু সহজ করে দেখে নিই। এর লক্ষণগুলো কেবল ল্যাবরেটরির রিপোর্টেই আটকে থাকে না, প্রতিদিনের জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। যেমন-১. সবসময় ক্লান্ত লাগা: রাতে হয়তো ৭-৮ ঘণ্টাই ঘুমালেন, কিন্তু সকালে ওঠার পর মনে হবে শরীরে এক ফোঁটা এনার্জি নেই। খুব ছোটখাটো কাজ করতে গেলেও মনে হয় শরীর আর চলছে না।২. ওজন নিয়ে যুদ্ধ: আপনি হয়তো নিয়ম মেনে খাচ্ছেন, নিয়মিত হাঁটছেন। তবুও ওজন কমছেই না। উল্টো দেখা যায় পেটের মেদ দিন দিন বেড়েই চলেছে।৩. মুড সুইং আর মানসিক চাপ: হরমোনের ওঠানামার কারণে হুট করে প্রচণ্ড রাগ, বিরক্তি বা ভীষণ একা লাগতে পারে। কোনো কারণ ছাড়াই মনে হবে আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, কিংবা তীব্র বুক ধড়ফড়ানি বা ‘অ্যাংজাইটি’ হচ্ছে।৪. ত্বক ও চুলের সমস্যা: মুখে বারবার ব্রণ ওঠা, গোছা গোছা চুল পড়া, কিংবা মুখ, থুতনি ও শরীরে অবাঞ্ছিত কালো লোম গজানো। এগুলোও কিন্তু এর খুব সাধারণ লক্ষণ।৫. মিষ্টি বা ভাতের তীব্র ক্রেভিং: অনেকের হুটহাট ভীষণ মিষ্টি, চকোলেট, কোল্ড ড্রিংকস বা ভাতজাতীয় খাবার খেতে ইচ্ছা করে। এটা আসলে অলসতা না, একে বলে 'ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স'। এর মানে হলো, আপনার শরীর খাবার থেকে ঠিকমতো শক্তি তৈরি করতে পারছে না, তাই বারবার ব্রেনকে মিথ্যে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে।৬. পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়া: কারও হয়তো পিরিয়ড অনেক দেরিতে হচ্ছে, কারও কয়েক মাস বন্ধ থাকছে, আবার কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্লিডিং হচ্ছে।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি কী জানেন? সব মেয়ের লক্ষণ কিন্তু এক রকম হয় না। কারও হয়তো ওজন অনেক বেড়ে যায়, আবার কারও ওজন একদম স্বাভাবিক থাকে। কারও পিরিয়ডের সমস্যা বেশি হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ক্লান্তি বা মানসিক চাপটা দিগুন হয়ে দেখা দেয়। অর্থাৎ, একেক জনের শরীরে এই ঝড়টা একেক রূপে আসে।" আরও পড়ুন: অল্প বয়সেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় কেন?PMOS কেন হয়?এখন মনে প্রশ্ন আসতেই পারে- আচ্ছা, এই PMOS আসলে কেন হয়? আমাদের শরীরে কী এমন ঘটে? আমাদের শরীরের হরমোনগুলো একটা টিমের মতো কাজ করে। সবাই মিলে শরীরটাকে সুন্দরভাবে চালায়। কিন্তু কোনো কারণে যখন এই হরমোন টিমের ব্যালেন্স বা ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তখন পুরো শরীরের কাজে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। বিশেষ করে আমাদের শরীরের ইনসুলিন নামের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন অলস হয়ে পড়ে, সে আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।তখন কী হয় জানেন? আপনি যে খাবারটা খাচ্ছেন, শরীর সেটা থেকে শক্তি তৈরি করার বদলে চর্বি হিসেবে জমাতে শুরু করে। আর এর প্রভাব পড়ে আপনার পুরো শরীরে, আপনার ওজন বাড়তে থাকে, শরীরে ভর করে রাজ্যের ক্লান্তি, হুটহাট মুড সুইং হয়। আর এই মেটাবলিজমের গোলমালের ধাক্কাটা গিয়ে লাগে ডিম্বাশয় বা ওভারিতে। ফলে ওভারি আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, পিরিয়ডও অনিয়মিত হয়ে যায়।তার মানে কী দাঁড়াল? গোড়ায় গলদ বলেই ডালে ফুল ফুটছে না! সমস্যাটা শুধু ওভারির একার না। মূল কথা হলো শরীরের ভেতরের পুরো ‘হরমোন আর মেটাবলিজম সিস্টেম’ বিগড়ে যায় বলেই এই এতসব কাণ্ড ঘটে।প্রতিকার ও সমাধানরোগের নাম যেহেতু বদলেছে, আমাদের সুস্থ হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গিও এখন বদলাতে হবে। শুধু পিরিয়ড ঠিক করার একটা ওষুধ খেয়ে নেওয়া এর আসল সমাধান না। এর জন্য আমাদের জীবনযাত্রায় কিছু ছোট কিন্তু দারুণ কার্যকরী পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন শুরুতেই আমাদের নজর দিতে হবে খাবারের থালায়, রিফাইন চিনি, প্যাকেটজাত খাবার আর ফাস্টফুডকে 'না' বলে খাবারে প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি আর ভালো ফ্যাট, যেমন কাঠবাদাম বা কাজুবাদাম বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি জিমে গিয়ে ভারী ওজন তুলতে হবে এমন কোনো কথা নেই, প্রতিদিন নিয়ম করে মাত্র ৩০ মিনিট একটু জোর কদমে হাঁটা, ইয়োগা বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করলেই আমাদের মেটাবলিজম ঠিক হতে শুরু করবে, যা এই সমস্যায় জাদুর মতো কাজ করে। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসিক স্বস্তি আর পর্যাপ্ত ঘুম; কারণ রাত জাগার অভ্যাস আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের হরমোনের সবচেয়ে বড় শত্রু।তাই প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। আর সবশেষে, নিজের মনমতো ওষুধ না খেয়ে একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ বা গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্লাড টেস্ট করিয়ে নেয়া উচিত, যাতে শরীরের মেটাবলিজম ঠিক করার জন্য সঠিক সাপ্লিমেন্ট বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।" শরীরকে ভালোবাসুন, সঠিক লাইফস্টাইল আর একটু সচেতনতাই পারে এই যুদ্ধ জয় করতে।

Go to News Site