Jagonews24
ঋণপত্র খুলতে অনীহা ব্যাংকগুলোর ভর্তুকির জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি, চাওয়া হয়েছে কর অব্যাহতি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতার প্রভাব নানাভাবে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেলের বর্ধিত অস্বাভাবিক ব্যয় সামলাতে গিয়ে মারাত্মক অর্থ সংকটে পড়েছে তেল বিপণনে একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে বেশি দামে কিনে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে গিয়ে নাজেহাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। যুদ্ধের শুরু থেকে প্রথম তিন মাসে প্রায় পৌনে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে দেশে তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণনে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। অর্থ সংকট মোকাবিলায় বিগত তিন মাসে দেওয়া লোকসানের ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে পুনর্ভরণ চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। চিঠিতে যুদ্ধ শুরুর আগের মতো কর নেওয়া কিংবা পুরোপুরি কর অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে। অর্থাভাবে ব্যাংকগুলো জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র খুলতে অনীহা দেখাচ্ছে বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও পড়ুন বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরালে ব্যয় বাড়বে কয়েকগুণ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির দুই কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, গত তিন মাসে জ্বালানি বিক্রিতে বড় অঙ্কের লোকসানের ভার সামলাতে ইতোমধ্যে ইআরএল-২ সহ বিপিসির কয়েকটি প্রকল্পের জন্য ব্যাংকে গচ্ছিত প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা ভাঙাতে হয়েছে। এটি বাদেও গত ছয় বছরে উদ্বৃত্তের সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে বিপিসিকে। প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার কর নিচ্ছে ৩৯ টাকা আমদানি করা জ্বালানিতে সরকার নির্ধারিত হারে কর নেয়। এর মধ্যে বিপিসির তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা করে শুল্ককর নিচ্ছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগে বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে এ করের পরিমাণ ছিল লিটারপ্রতি ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা। সে হিসেবে গত তিন মাসে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা শুধু ডিজেলে শুল্ককর দিতে হয়েছে বিপিসিকে। আমদানি করা জ্বালানির বর্ধিত মূল্যের কারণে ডিজেল আমদানিতে ফেব্রুয়ারির চেয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির ভর্তুকি ৬০ টাকা সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রাহক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা। বিপিসির তথ্য বলছে- সরকারের স্বয়ংক্রিয় প্রাইসিং ফর্মুলা অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১৭৬ টাকা হওয়ার কথা। সেখানে লিটারপ্রতি ৬১ টাকা কমে ডিজেল বিক্রি করতে হচ্ছে বিপিসিকে। একইভাবে অকটেন লিটারপ্রতি ১৬ টাকা, পেট্রোল ১৭ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা কমে বিক্রি করছে বিপিসি। তিন মাসে বিপিসির লোকসান ১২৭৩৮ কোটি টাকা বেশি দামে কিনে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করতে গিয়ে বিপিসিকে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গত তিন মাসে ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে দুই হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, এপ্রিল মাসে সাত হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ এবং মে মাসে দুই হাজার ৬২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে বিপিসি। আমরা সবাই মিলে দেশের একটি বড় সংকট মোকাবিলা করছি। এটি আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় স্বার্থ। তবু গত তিন মাসে বিপিসিতে লোকসান দিতে গিয়ে অর্থের সংকট তৈরি হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছি।-বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন আমদানি করা জ্বালানি তেলের ৫৩টি পার্সেলের এলসি পেমেন্ট করতে গিয়ে এ অর্থ লোকসান হয়েছে বলে জানায় বিপিসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, মার্চ মাসে ১৭টি পার্সেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল চার হাজার কোটি টাকা। একই পরিমাণ জ্বালানি এপ্রিল মাসে কিনতে ব্যয় হয়েছে আট হাজার একশ কোটি টাকা। এলসি খুলতে ব্যাংকের অনীহা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বিপিসির এলসি কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকও যুক্ত। নিয়ম অনুযায়ী এলসি খোলার সময় এলসি সমমূল্যের টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলার সময় সমপরিমাণ টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আরও পড়ুন জ্বালানি খাতের আরেক বিপিসি! অনেক ব্যাংক অগ্রিম টাকা জমা না দিলে এলসি নিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে আমদানি মূল্য পরিশোধে সময়ক্ষেপণ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এলসি খোলা ও মূল্য পরিশোধে সময়ক্ষেপণের বিষয়টি দৃশ্যমান হলে সরবরাহকারীরা পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে না। গত ১০ বছরে ব্যাংকস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে সূত্র জানায়, চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরের শুরুতে ব্যাংকে দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের পাশাপাশি এসঅ্যান্ডডি (শর্ট টার্ম ডিপোজিট) মিলে বিপিসির ব্যাংক হিসাবগুলোতে প্রায় ৩১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা স্থিতি ছিল। এর মধ্যে সাধারণ হিসাবে ব্যাংকে জমা ছিল ২৩ হাজার ৮৬৪ কোটি ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮৩ টাকা, এফডিআর (দীর্ঘমেয়াদি) ছিল ৫ হাজার ৮৩৪ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৮৯৬ টাকা এবং এফডিআর (স্বল্পমেয়াদি) হিসেবে ১ হাজার ৮২৭ কোটি ৯২ লাখ ৮১ হাজার ৬৭৪ টাকা জমা ছিল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে। ভর্তুকির পুরোটাই বিপিসিকে বহন করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবে গত তিন মাসে বিপিসির প্রায় পৌনে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। এতে বিপিসির জমা করা তারল্যে টান পড়েছে। এটি যেহেতু জাতীয় সংকট, যেহেতু সামনে বাজেট, সেহেতু ভর্তুকির বিষয়ে বিপিসির চিঠি পাওয়ার পর করণীয় নির্ধারণ করতে আমরাও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী সূত্র বলছে, বর্তমানে সে স্থিতি কমে ১৮ হাজার কোটিতে নেমেছে, যা বিপিসির গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্থিতি। বিপিসি বলছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিপিসিকে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই মাসের জ্বালানি তেলের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। অর্থ সংকট সমাধানে বিপিসির তিন পরামর্শ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দেওয়া চিঠিতে বিপিসি জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে সরকারি সিদ্ধান্তে আমদানি মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রিতে লোকসান ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বিপিসিকে ভর্তুকি হিসেবে পুনর্ভরণ করা, বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মার্চ-২৬ সময় থেকে যুদ্ধ (মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ) শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক-করাদি আগের হার অনুযায়ী গ্রহণ অথবা অব্যাহতি দেওয়া এবং আর্থিক ক্ষতি নিরসনে বিপিসির প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশেও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়মিত পুনর্নির্ধারণ করা। আরও পড়ুন পরিশোধিত জ্বালানির ৮০ শতাংশ এক চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে বিপিসি বলছে, গত ১ জুন ডিজেল প্রতি লিটার ১৭৬ টাকা, অকটেন ১৬১ টাকা, পেট্রোল ১৫৭ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৩ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। গত ৬ বছরে উদ্বৃত্তের সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা কোষাগারে ২০২০ সালে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন-২০২০’ আইন করে সরকার। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি আইনটি পাস হয়। মূলত সরকারের ব্যাংকঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিন ধরে স্থিতি থাকা দুই লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা উন্নয়নের কাজে লাগানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আইনটি করা হয়। আইন তৈরির পর ওই আইনের ধারা ৪ ও ৫ এর বিধান অনুযায়ী ওই মাস থেকেই বিপিসি থেকে টাকা নেওয়া শুরু করে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত ‘কোয়াসি করপোরেশনের উদ্বৃত্ত আয়’ কোডে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা কোষাগারে জমা দিয়েছে বিপিসি।’ বিপিসি ও মন্ত্রণালয় যা বলছে জ্বালানি তেল বিক্রিতে অস্বাভাবিক লোকসান মোকাবিলা এবং মন্ত্রণালয়ে ভর্তুকির অর্থ চাওয়া সম্পর্কে কথা হলে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে দেশের একটি বড় সংকট মোকাবিলা করছি। এটি আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় স্বার্থ। তবু গত তিন মাসে বিপিসিতে লোকসান দিতে গিয়ে অর্থের সংকট তৈরি হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছি।’ আরও পড়ুন ইআরএল-২ / ঝুলে থাকা নতুন রিফাইনারি বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগোলো বিপিসি এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বে জ্বালানির সংকট তৈরি হচ্ছে। আমরা যেহেতু জ্বালানিতে আমদানিনির্ভর, সেহেতু দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ভর্তুকির পুরোটাই বিপিসিকে বহন করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবে গত তিন মাসে বিপিসির প্রায় পৌনে ১৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। এতে বিপিসির জমা করা তারল্যে টান পড়েছে। এটি যেহেতু জাতীয় সংকট, যেহেতু সামনে বাজেট, সেহেতু ভর্তুকির বিষয়ে বিপিসির চিঠি পাওয়ার পর করণীয় নির্ধারণ করতে আমরাও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। দেখা যাক সরকার বাজেটে এ নিয়ে কেমন বরাদ্দ রাখে।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। বিপরীতে ইসরায়েলসহ আশপাশের আরব দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ
Go to News Site